ঢাকা, ১৪ অক্টোবর-২০২৬
ওয়াহিদ মুরাদ, (চীফ রিপোর্টার) : খুলনার দিঘলিয়ায় নজরুল বর্ষ ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্মের ওপর সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৪ অক্টোবর (বুধবার) দুপুর ১২টায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দিঘলিয়া উপজেলা মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল— ‘সাম্য, স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার: নজরুলের চিন্তায় বৈষম্যহীন সমাজ’।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন দাশ গুপ্তের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আলহাজ সরোয়ার খান ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক মো. মনিরুল হক বাবুল, ডা. শাওন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমা আক্তার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা টি এম শাহআলম, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সোহাগ হোসেন, উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কনক রানী গণপতি, উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা সাঈদা খাতুন, উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার মাকসুদা খানম, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও পবিত্র গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে ক্ষুদে শিল্পীরা ইসলামী সংগীত, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য ও কাজী নজরুল ইসলামের রচিত সংগীত পরিবেশন করে। তাদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তাঁর সাহিত্য, কবিতা, গান ও অন্যান্য সৃষ্টিকর্মে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের আহ্বান স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো মানুষের প্রতি বৈষম্য নয়—নজরুলের জীবন ও কর্ম থেকে এই মানবিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
প্রভাষক মো. মনিরুল হক বাবুল তাঁর বক্তব্যে নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় নজরুলের অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নজরুল নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদায় দেখেছেন। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘নারী’-তে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এই পঙ্ক্তির মধ্য দিয়ে কবি সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণে নারী-পুরুষের সমান অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে আজীবন কথা বলেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম আজও মানুষকে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্য, ভালোবাসা ও মানবতার পথে চলার প্রেরণা দেয়।
সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুজন দাশ গুপ্ত কাজী নজরুল ইসলামের বর্ণাঢ্য জীবন, সাহিত্যকর্ম ও প্রতিবাদী চেতনা নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, নজরুল অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর লেখনীতে যেমন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি ফুটে উঠেছে মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সাম্যের আহ্বান।
তিনি আরও বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে নজরুলের বিদ্রোহী লেখনী শাসকগোষ্ঠীকে বিচলিত করেছিল। তাঁর ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি প্রকাশের পর ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কারাবন্দি করে। কারাগারেও তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। তাঁর প্রতিবাদী চেতনা ও আপসহীন অবস্থান তাঁকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিদ্রোহী কবির মর্যাদা দিয়েছে। নজরুলের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে ইংরেজ কবি পি.বি শেলি ও জন কিটসের রোমান্টিক ও মানবিক কাব্যচেতনার তুলনামূলক আলোচনা প্রসঙ্গেও তিনি বক্তব্য দেন।
ইউএনও বলেন, নজরুলের কবিতা ও গানে বিদ্রোহের পাশাপাশি প্রেম, প্রকৃতি, সৌন্দর্য এবং প্রিয়তমার প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছে। শিশুদের প্রতিও কবির ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। ছোটদের উপযোগী অসংখ্য কবিতা ও গান রচনার মাধ্যমে তিনি শিশু-কিশোরদের কল্পনা, আনন্দ ও মানবিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
নজরুলের কালজয়ী সংগীতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ গানটি বাঙালি মুসলমানের ঈদ উদযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর গান ধর্মীয় অনুভূতি, আনন্দ ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রকাশ। নজরুলের সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সমাজে সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় নজরুলের দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে পারে। তাই পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমেও নজরুলের আদর্শ ছড়িয়ে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। উপজেলা তথ্যসেবা কর্মকর্তা সাঈদা খাতুন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
চিত্রাঙ্কন, রচনা প্রতিযোগিতা, নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি, গজল ও নজরুলসংগীতসহ বিভিন্ন বিভাগে প্রথম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, মাদ্রাসা ও কলেজ পর্যায়ের প্রতিযোগীরা অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ১৭ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩০ জন, মাদ্রাসা পর্যায়ে ১৫ জন এবং কলেজ পর্যায়ে ৯ জনসহ মোট ৭১ জন বিজয়ীকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
নজরুলের সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
Related News :

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ

কয়রা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে নিন্দা

গাজিরহাটে চেয়ারম্যান প্রার্থী মুকিত আলীর পক্ষে নির্বাচনী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত


