ঢাকা, ২৪ আগস্ট-২০২৬
ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : ‘এক সময় বিয়ে মানেই ছিল পালকি। সন্ধ্যা নামতেই শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর বেহারাদের সুরেলা হাঁকডাকে মুখর হয়ে উঠত পুরো গ্রাম। ফুল, রঙিন কাপড় আর আলপনায় সাজানো পালকিতে করে নববধূকে নিয়ে যাওয়া হতো শ্বশুরবাড়ি। এখন সেই দৃশ্য আর কোথাও দেখা যায় না।’
খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। একসময় এ উপজেলার সেনহাটি, বারাকপুর, গাজীরহাট, দিঘলিয়া সদর, যোগীপোল ও আড়ংঘাটাসহ বিভিন্ন গ্রামে বিয়ের শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ ছিল পালকি। কিন্তু আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, মোটরসাইকেল, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে পালকি এখন পুরোপুরি বিলুপ্ত। দিঘলিয়ার ঐতিহ্যের অংশ হলেও বর্তমানে কোনো বিয়েতে পালকি ব্যবহার করতে দেখা যায় না।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগেও গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ বিয়েতে কনেকে পালকিতে করেই বিদায় দেওয়া হতো। পালকির চার কোণে থাকত দক্ষ বেহারা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় তারা ছন্দ মিলিয়ে হাঁটতেন এবং মাঝে মাঝে পালকির গান গেয়ে পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলতেন। সেই গানে থাকত কনের বিদায়ের বেদনা, নতুন জীবনের আশা এবং গ্রামীণ জীবনের আবেগ।
সেনহাটির প্রবীণ বাসিন্দা অমল কুমার দাস (৭৮) বলেন, ‘আমাদের ছোটবেলায় পালকি ছাড়া বিয়ে কল্পনাই করা যেত না। কনের বাড়ি থেকে শ্বশুরবাড়ি পর্যন্ত পালকি নিয়ে যেত বেহারারা। এখনকার ছেলেমেয়েরা পালকি শুধু বইয়ে দেখে।’
গাজীরহাটের আরেক প্রবীণ আব্দুল কাদের শেখ (৮২) জানান, ‘তখন রাস্তা ছিল কাঁচা, যানবাহনও ছিল না। তাই পালকিই ছিল সবচেয়ে নিরাপদ ও সম্মানজনক বাহন। এখন উন্নত সড়ক হয়েছে, গাড়ি এসেছে, তাই পালকি হারিয়ে গেছে।’
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের মতে, পালকি শুধু একটি বাহন ছিল না; এটি ছিল বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতীক। পালকিকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বেহারাদের একটি স্বতন্ত্র পেশা এবং পালকির গান নামের লোকসংগীতের একটি ধারা। নগরায়ন ও আধুনিকতার প্রভাবে এসব ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।
দিঘলিয়া উপজেলা প্রশাসনের তথ্যেও উপজেলার দীর্ঘ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও লোকজ শিল্পের কথা উল্লেখ রয়েছে। সেনহাটির মৃৎশিল্প, প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের পাশাপাশি পালকিও একসময় এই জনপদের গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
সংস্কৃতিপ্রেমীরা মনে করেন, হারিয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। খুলনা বিভাগীয় জাদুঘর কিংবা স্থানীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে একটি ঐতিহ্যবাহী পালকি সংরক্ষণ, লোকজ মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রতীকী পালকি প্রদর্শন এবং নতুন প্রজন্মকে এ ইতিহাস জানাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
আজ আর দিঘলিয়ার কোনো গ্রামে শোনা যায় না বেহারাদের ছন্দময় হাঁকডাক, দেখা যায় না ফুলে সাজানো পালকি। সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেলেও গ্রামীণ বাংলার সেই ঐতিহ্য এখনও প্রবীণদের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে। সেই স্মৃতিই মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে শুধু একটি বাহন নয়, হারিয়ে যায় একটি জনপদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগেরও একটি মূল্যবান অধ্যায়।
Related News :

খুলনা বিভাগে নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনারদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

খুলনায় নদীতে ভাসমান দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ


