ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর-২০২৫
ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : শীতের আমেজ নামতেই খুলনার দিঘলিয়ায় শুরু হয়েছে খেজুর গাছ প্রস্তুত, রস সংগ্রহ এবং গুড় তৈরির ঐতিহ্যবাহী কর্মযজ্ঞ। গ্রামের প্রতিটি পথ, বাড়ির আঙিনা আর খোলা মাঠজুড়ে এখন এক ধরনের উষ্ণ ব্যস্ততা—কেউ গাছ পরিষ্কার করছেন, কেউ খেজুর গাছে নলী বসাচ্ছেন, আবার কেউ ভোরের আলো ফোটার আগেই হাড়ি নামিয়ে গুড় তৈরির চুলার পাশে বসেছেন।
শীতের শুরুতে খেজুর গাছ প্রস্তুত, রস সংগ্রহ আর গুড় তৈরির এই ঐতিহ্য শুধু খাদ্য নয়—গ্রামীণ জীবনের আবেগ, স্মৃতি আর সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ। শীত যত জোরে লাগে, তত প্রাণ ফিরে পায় দিঘলিয়ার খেজুর রসের এই মিষ্টিময় যাত্রা। উপজেলার বারাকপুর, সেনহাটি, দিঘলিয়া ও গাজিরহাট এলাকার খেজুর গাছগুলোতে এখন চলছে মৌসুমী প্রস্তুতির কাজ। গাছিরা প্রথমে খেজুর গাছের পুরনো অংশ ছেঁটে মসৃণ করেন, এরপর ধারালো দা দিয়ে কেটে দেন রস ঝরার জায়গা। তারপর বসানো হয় মাটির হাড়ি ও নলী। শীত যত বাড়ে, রসও তত স্বচ্ছ ও মিষ্টি হয়—এটাই খেজুর রসের বৈশিষ্ট্য।
গাছি গোলাম হোসেন বলেন, ‘শীতের শুরু মানেই আমাদের কাজ শুরু। আগে গাছ পরিষ্কার করি, তারপর নলী বসাই। দুই–তিন দিন পর থেকেই রস ঝরে। সকালে হাড়ি নামানোর পরই গুড় তৈরির কাজ শুরু করতে হয়।’ রাতভর ঝরা রস সংগ্রহের পর ভোরে শুরু হয় গুড় তৈরির পর্ব। বড় কড়াই বা টিনের তৈরি তাফালে রস ঢেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দিতে হয়। রস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আঠালো হলে তৈরি হয় খাঁটি খেজুরের গুড়। বাতাসে তখন ভেসে বেড়ায় এক অনন্য মিষ্টি ঘ্রাণ। নারিকেল পাতার হাতপাখা দিয়ে আগুনের জ্বাল বাড়ানো, রস নাড়াচাড়া করা—সব কাজেই জড়িত থাকে পরিবারের অন্য লোকেরাও। বারাকপুরের গুড় প্রস্তুতকারী হালিম শেখ বলেন, ‘রস ভালো হলে গুড়ের মানও ভালো হয়। ঠান্ডা বেশি থাকলে রস ঘন হয়। তাই শীতের আগমনে আমাদের এই কাজ জমে ওঠে।’
স্থানীয় বাজারে দিঘলিয়ার গুড়ের আলাদা সুনাম রয়েছে। ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে গুড় কিনে নেন। পিঠা-পায়েসের মৌসুম হওয়ায় মানুষের মধ্যেও খাঁটি গুড়ের চাহিদা বেড়ে যায়। শীতের শুরুতেই বাজারে বাড়ে গুড়ের চাহিদা। দিঘলিয়ার গুড় দীর্ঘদিন থেকেই মানসম্মত হিসেবে পরিচিত। পিঠা-পায়েসের মৌসুম হওয়ায় এই গুড়ের কদর আরও বেড়ে যায়। যদিও চ্যালেঞ্জ আছে, তবুও দিঘলিয়ার মানুষের কাছে শীতের শুরু মানেই একটি স্বাদময় উৎসব—গাছ প্রস্তুত, রস ঝরা আর গুড় তৈরির মধুময় আনন্দ। এই ঐতিহ্য শুধু খাবারের নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের গভীর আবেগ ও সংস্কৃতির এক অমূল্য অংশ।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ কিশোর আহমেদ জানান, এ পেশার সঙ্গে এ উপজেলায় প্রায় ১১০জন কৃষক জড়িত আছে যাদের গাছি বলা হয়। ব্লকে খেজুর গাছ আছে ৭২১৫ টি। প্রতিটি খেজুর গাছ থেকে গুড় উৎপাদন করা যায় ৮ থেকে ১২ কেজি। গত মৌসুমে প্রতিটি গাছ থেকে গুড় উৎপাদন করা হয়েছিল গড়ে ৯ কেজি। চলতি মৌসুমে উপজেলায় গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭২১৫০ কেজি। গত মৌসুমে গুড়ের মূল্য ছিল ৩০০ টাকা প্রতি কেজি, এবারও তেমনটি থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে। গত মৌসুমে প্রতি কেজি পাটালির মূল্য ছিল ৩৮০ টাকা, এবার তা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৪০০ টাকায়।
তবে গাছিদের দাবি, খেজুর গাছের সংখ্যা আগের মতো নেই। নতুন করে গাছ লাগানোর আগ্রহ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে রস সংগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। গাছি গোলাম হোসেন বলেন, “আগে প্রতিটি বাড়ির পাশে দুই–তিনটা খেজুর গাছ থাকত। এখন অনেকেই গাছ কেটে ফেলেছে। নতুন গাছ লাগালে আবার এই ঐতিহ্য বাঁচবে।’
দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘খেজুর রস ও গুড় গ্রামীণ ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমির আইলে এবং পতিত জমিতে খেজুরগাছ লাগানো বাড়াতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে শুধু ঐতিহ্যই বাঁচবে না—গ্রামীণ অর্থনীতিতেও যোগ হবে নতুন গতি।’
Related News :

খুলনা বিভাগে নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনারদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

খুলনায় নদীতে ভাসমান দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ


