খুলনার দিঘলিয়ায় আমের বাম্পার ফলন

ঢাকা, ০৭ জুন-২০২৬

ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় এ বছর আমের বাম্পার ফলন ঘিরে চাষিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও আশাবাদ দেখা দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে নানা জাতের সুস্বাদু আম। গাছভর্তি আমের দৃশ্য যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যের সঙ্গে যোগ করেছে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য। এ বছর অনুকূল আবহাওয়া, নিয়মিত পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের তদারকির কারণে আমের গুটি ঝরে পড়া তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। ফলে অধিকাংশ বাগানেই ফলনের পরিমাণ গত বছরের তুলনায় অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন চাষিরা।

উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়ন, সেনহাটি, গাজীরহাট, বারাকপুর ও আশপাশের এলাকায় ল্যাংড়া, হিমসাগর, আম্রপালি, মল্লিকা, কাটিমন ও ব্যানানা ম্যাংগোসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের আমের চাষ বেড়েছে। বিশেষ করে আম্রপালি ও হিমসাগর জাতের গাছে ফলনের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। অনেক বাগানে আমের ভারে নুয়ে পড়েছে গাছের ডাল।

স্থানীয় আমচাষি এডভোকেট শাহাদাত হোসেন জানান, ‘গত বছর আবহাওয়ার কারণে ফলন কিছুটা কম হয়েছিল। তবে এ বছর গাছে প্রচুর মুকুল আসে এবং গুটি ঝরে পড়াও কম হয়েছে। ফলে অন্য বছরে তুলনায় এ বছর আমের ফলন অনেক ভালো।’ কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো পরিচর্যা করায় পোকামাকড়ের আক্রমণও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি আশা করছেন, মৌসুমের শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ বছর ভালো লাভের মুখ দেখবেন চাষিরা।

আরেক চাষি সবুজ বলেন, ‘বর্তমানে দিঘলিয়ায় অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে আমচাষে আগ্রহী হচ্ছেন। নতুন জাতের আম চাষে লাভ বেশি হওয়ায় তরুণ উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসছেন। তিনি জানান, এ বছর বাজারমূল্য ভালো থাকলে গত কয়েক বছরের লোকসান অনেকটাই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।’

দিঘলিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আমচাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও চূড়ান্ত উৎপাদনের হিসাব মৌসুম শেষে নির্ধারণ করা হবে, তবুও সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ কপিল বসাক বলেন, বর্তমানে কৃষকরা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আমচাষের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষি বিভাগ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং রোগবালাই দমনে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদনের জন্য ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এতে আমের গুণগত মান ভালো থাকার পাশাপাশি বাজারমূল্যও বাড়ছে। তিনি আরও জানান, কৃষকদের মধ্যে এখন সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকেই রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ ফল উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন। এতে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুজন দাস গুপ্ত আমচাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তিনি চাষিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন কোনো অবস্থাতেই আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ফরমালিন ব্যবহার না করা হয়। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নজরদারি বাড়ানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া তিনি প্রথাগত চাষাবাদের বাইরে এসে উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের আম চাষে কৃষকদের আরও বেশি আগ্রহী হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ দিঘলিয়াকে ভবিষ্যতে একটি সম্ভাবনাময় আম উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত করতে পারে।

ইতিমধ্যে আম পাঁকা শুরু হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দিঘলিয়ার সুস্বাদু আম দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
×