ঢাকা, ০৭ জুন-২০২৬
ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহিদ মুরাদ, (বিশেষ প্রতিবেদন) : বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্টফোন ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে মোবাইল ফোন শিক্ষা, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তিকে সহজ করে তুললেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়িয়ে তুলছে মোবাইল আসক্তি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী দিনের বড় একটি অংশ কাটাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন গেম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্মে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তাদের পড়াশোনা, মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক সম্পর্ক এবং স্বাভাবিক বিকাশ।
এক সময় স্কুল শেষে মাঠে খেলাধুলা, বই পড়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ছিল শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোনের ছোট্ট পর্দা। হাতে মোবাইল পেলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব বা বিভিন্ন অনলাইন গেমে। অনেক শিক্ষার্থী এমনও আছে, যারা মোবাইল ছাড়া কয়েক ঘণ্টা থাকতেই অস্বস্তি বোধ করে।
কেন বাড়ছে মোবাইল আসক্তি? : শিক্ষাবিদদের মতে, মোবাইল আসক্তির অন্যতম কারণ হলো সহজলভ্য ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণ। প্রতিনিয়ত নতুন ভিডিও, নতুন পোস্ট এবং বিনোদনমূলক কনটেন্ট ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনের সঙ্গে আটকে রাখে। এছাড়া অনলাইন গেমের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশও কিশোর-কিশোরীদের আকৃষ্ট করছে। ভার্চুয়াল জগতে অর্জন, পুরস্কার এবং বন্ধুদের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগ তাদের বাস্তব জীবনের চেয়ে বেশি আগ্রহী করে তুলছে।
করোনা মহামারির সময় অনলাইন শিক্ষার জন্য মোবাইল ফোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। অনেক শিক্ষার্থী তখন থেকেই মোবাইল ব্যবহারে অতিমাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা কমলেও মোবাইল ব্যবহারের অভ্যাস আর কমেনি। অভিভাবকদের ব্যস্ততা এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবও একটি বড় কারণ। অনেক পরিবারে সন্তানদের সময় দেওয়ার পরিবর্তে মোবাইল ফোনই যেন তাদের বিনোদনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পড়াশোনায় মারাত্মক প্রভাব : মোবাইল আসক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষাজীবনে। শিক্ষকেরা বলছেন, বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না। বই পড়ার আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং স্মৃতিশক্তির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খুলনার এক কলেজ শিক্ষক বলেন, ‘আগে শিক্ষার্থীরা অবসরে বই পড়ত, এখন বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মোবাইলে ব্যস্ত থাকে। ফলে তাদের মনোযোগের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।’ পরীক্ষার আগে পড়াশোনার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করার কারণে ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাত জেগে মোবাইল ব্যবহারের কারণে সকালে ক্লাসে উপস্থিত থাকলেও তারা ক্লান্ত ও অমনোযোগী থাকে।
মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে : মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের জীবন দেখে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের নিয়ে হতাশায় ভোগে। অন্যের সাফল্য, ভ্রমণ বা বিলাসী জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করতে গিয়ে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। এছাড়া মোবাইল ব্যবহারে বাধা দিলে অনেকের মধ্যে রাগ, বিরক্তি এবং অস্থিরতা দেখা যায়, যা আসক্তির লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে উদ্বেগ, হতাশা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে পারে।
শারীরিক সমস্যাও বাড়ছে : চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের কারণে শিশু-কিশোরদের মধ্যে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘাড় ও মেরুদণ্ডে ব্যথা, অনিদ্রা এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না এবং পরদিন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়।
সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব : একই ঘরে বসেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথোপকথনের পরিবর্তে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা বাড়ছে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কের পরিবর্তে ভার্চুয়াল যোগাযোগ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
অভিভাবকদের করণীয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল আসক্তি কমাতে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ রাখতে হবে। মোবাইল ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। খাবার টেবিল, পড়ার সময় এবং ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা উচিত। অভিভাবকদের নিজেদেরও মোবাইল ব্যবহারে সংযমী হতে হবে। কারণ শিশুরা বড়দের আচরণ থেকেই অনেক কিছু শেখে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা, সেমিনার এবং কাউন্সেলিং কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও পাঠচক্রের মতো কার্যক্রম বৃদ্ধি করলে শিক্ষার্থীরা বিকল্প ইতিবাচক কাজে যুক্ত হতে পারবে। এতে মোবাইল নির্ভরতা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিত্রাণের পথ : বিশেষজ্ঞরা মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন— প্রতিদিন মোবাইল ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ব্যবহার বন্ধ করা। নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করা। বই পড়া ও সৃজনশীল কাজে অংশগ্রহণ বাড়ানো। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আত্মনিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা। প্রয়োজনে মনোবিদ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া।
উপসংহার : স্মার্টফোন আধুনিক জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। তবে এর ব্যবহার যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পদ। তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও মানসিক বিকাশকে সুরক্ষিত রাখতে এখনই মোবাইল আসক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে প্রযুক্তির সুফল গ্রহণের পাশাপাশি এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নতুন প্রজন্মকে রক্ষা করতে।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহিদ মুরাদ, (সিনিয়র সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও সংগঠক) দিঘলিয়া, খুলনা।
Related News :

নিখোঁজ শিশুর অনিশ্চিৎ ভবিষ্যৎ : আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা জরুরী : নিকোলাস বিশ্বাস

ইদানীং একটা নতুন পেশা সৃষ্টি হয়েছে কনটেন্ট ক্রিয়েটর, কেউ আবার বলে ইনফ্লুয়েন্সার : 'নোংরামির চূড়ান্তে...

যোগ্য নেতা ও নেতৃত্ব : চেনার সহজ উপায়

অপ্রিয় সত্য ঘটনার অসাধারণ আত্মপ্রকাশ

অনিচ্ছাকৃত বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেন 'মবিনা জান্নাত'


