দুই দশকের ‘নারী ফাঁদে ফেলার’ অভিযোগ : প্রভাবশালী হলেই কি বিচার বিলম্বিত হবে?

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মক্ষেত্র-মোকাদ্দেস হানিফের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, বিচারপ্রার্থীর প্রশ্ন—প্রভাবশালী হলেই কি বিচার বিলম্বিত হবে?

ঢাকা, ০৪ আগস্ট-২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন : নারীদের প্রতি লালসা, কর্মক্ষেত্রে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা এবং পরবর্তীতে নানা ধরনের প্রতারণামূলক কৌশলে তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার অভিযোগ মোকাদ্দেস হানিফের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে নারীদের এমনভাবে ফাঁদে ফেলার কর্মকাণ্ড তার নিয়মিত ও অভ্যাসগত আচরণে পরিণত হয়েছে। তবে অভিযোগকারীর দাবি, এই কর্মকাণ্ডের অভিযোগ কেবল তার পরবর্তী কর্মজীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের আগেও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকালে মোকাদ্দেস হানিফের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নারীঘটিত ঘটনার অভিযোগ ও আলোচনা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানকাল থেকেই নারীদের ঘিরে বিভিন্ন ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে এবং পরবর্তী কর্মজীবনে নারীদের সঙ্গে কথিত প্রতারণা ও ফাঁদে ফেলার অভিযোগের সঙ্গে এসব ঘটনাকে মিলিয়ে দেখলে একটি দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতার অভিযোগ সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন অভিযোগ থাকলেও কোনো নারী কেন সাহস করে তার এই জাল বা চক্র ভেঙে বের হতে পারেননি?

অভিযোগ রয়েছে, মোকাদ্দেস হানিফ তার কর্মস্থল ও অফিসে নারীদের চাকরির কথা বলে নিয়োগ করতেন এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন কৌশলে তাদের নিজের তৈরি ফাঁদে ফেলতেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে নেওয়া হতো যে, নারীদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন পর্যন্ত গড়াত—যা তার নিত্যনৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডের অংশে পরিণত হয়েছিল বলে অভিযোগ। আর কোনো নারী এ ধরনের আচরণের প্রতিবাদ করলে কিংবা সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে, তাকে বিভিন্নভাবে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের মেয়ে আমরিন রাখির সহায়তায় এবং মোকাদ্দেস হানিফের স্ত্রী শামীমা সুলতানার সহযোগিতায় কখনো অর্থের ব্যবস্থা, কখনো উন্নত জীবনের সুযোগ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ওই নারীদের দেশ থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হতো— Md Mocaddes Hanif Tolin এর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও রয়েছে।

শুধু তাই নয়, একাধিক নারীকে ব্ল্যাকমেইল করা, তাদের গর্ভপাতের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি করা, প্রতারণার ফাঁদে ফেলে প্রেমের নাটক সাজানো এবং স্ত্রী শামীমা সুলতানার সঙ্গে সংসারে অশান্তির গল্প বলে দ্রুত ডিভোর্স দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কখনো সামাজিক চাপের কারণে সংসার করছেন, কখনো বা সন্তানের কারণে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন—এমন নানা কথাও ওই নারীদের বলা হতো বলে অভিযোগ। এসব প্রতারণামূলক কথাবার্তার মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য মিথ্যা বিয়ের প্রলোভন দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

একই ধরনের অভিযোগের শিকার হওয়ার দাবি এক ভুক্তভোগী নারীর : এমনই একজন ভুক্তভোগী নারী, যিনি মোকাদ্দেস হানিফের অফিসে কর্মরত ছিলেন বলে দাবি করেন, অভিযোগ করেন যে তাকেও একই ধরনের প্রতারণার জালে ফেলা হয়েছিল। তার সঙ্গে সম্পর্কের পর একটি সন্তান জন্ম নেওয়ার পরও মোকাদ্দেস হানিফ ওই সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে তার স্ত্রী শামীমা সুলতানাকে সামনে রেখে, গণমাধ্যম, বিপুল অর্থসম্পদ, ব্যবসায়িক প্রভাব এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও কর্মকাণ্ড আড়াল করে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আদালতে গড়ায় মামলা : পরবর্তীতে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫-এর মামলা নং ১৯৪/২৪-এ প্রতারণার মাধ্যমে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং এর ফলে একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর তার স্বীকৃতি অস্বীকার করার অভিযোগে মোকাদ্দেস হানিফের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালিত হয়। মামলার নথি ও আদালতের কার্যক্রম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল মোকাদ্দেস হানিফের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) ও ১৩ ধারায় অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের সময় তিনি জেল হেফাজতে ছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, এরপরও বিষয়টি থেমে থাকেনি। প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অপব্যবহার, নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আড়াল করা এবং নিজেদেরই ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপনের নানা কৌশল নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। নানা আইনি কৌশলে জামিনে বের হয়ে মামলাটি স্থগিত করানোর জন্য উচ্চ আদালত পর্যন্ত বিষয়টি নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মামলাটি পরবর্তীতে বিভিন্ন বেঞ্চে ঘুরতে থাকে। একপর্যায়ে আপিল বিভাগ মামলাটির দ্রুত শুনানি এবং শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ—Best Interests of the Child—নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় এনে সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালত বেঞ্চকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন বলে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে High Court Bench Annex-4, Criminal Appeal No. 3534/25-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

হাইকোর্টে দীর্ঘ শুনানি, ওঠে একাধিক গুরুতর অভিযোগ : অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে দীর্ঘ শুনানির সময় মোকাদ্দেস হানিফের বিরুদ্ধে নারীদের নিয়ে কথিত অভ্যাসগত কর্মকাণ্ড, প্রতারণামূলক আচরণ, ধর্ষণের অভিযোগ এবং ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর পিতৃত্ব অস্বীকারের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। এ ছাড়া বাদী ও তার সন্তানকে দিনের পর দিন হুমকি ও জাননাশের মতো গুরুতর হুমকি দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এসব অভিযোগ মোকাদ্দেস হানিফ ও তার স্ত্রী শামীমা সুলতানার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মহলে উঠে আসে বলেও অভিযোগকারীর বক্তব্য। অভিযোগকারীর আরও দাবি, বিভিন্ন সময়ে ‘সমঝোতা’ বা ‘সুরাহা’র কথা বলে অযথা বাদীকে হয়রানি করা, সময়ক্ষেপণ করা এবং মামলাটিকে ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এসব বিষয়ও আদালতের নজরে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আইনি লড়াইয়ে কারা ছিলেন? : মোকাদ্দেস হানিফের পক্ষে ফাইলিং অ্যাডভোকেট হিসেবে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, আর শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে বিভিন্ন প্রমাণ, রেফারেল মামলা ও শুনানির বিষয়গুলো উপস্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট মাননীয় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল—এমন তথ্যও অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্যে সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, একজন অভিযুক্তের অর্থ, প্রভাব ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে দেশের অনেক নামকরা ও প্রতিভাবান আইনজীবীও তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন—যার ফলে একজন নারী বিচারপ্রার্থী এবং তার সন্তানকে বছরের পর বছর আইনি জটিলতা, হয়রানি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়েছে বলে অভিযোগ। অবশেষে মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশনা দিয়ে নিম্ন আদালতকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয় এবং অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের বেঞ্চ থেকে মামলাটি খারিজ/ডিসমিস করে দেওয়া হয়।

প্রশ্ন এখন একটাই—প্রভাবশালী হলেই কি বিচারপ্রার্থীর পথ কঠিন হবে? 

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি থেকে যায়- একজন নারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার সামাজিক পরিচয়, অর্থনৈতিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব কি তার বিচার পাওয়ার পথে কোনো সুবিধা তৈরি করতে পারে? আর যদি একজন নারী দীর্ঘ সময় ধরে প্রতারণা, ভয়ভীতি, সামাজিক অপমান এবং আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজের ও সন্তানের ন্যায়বিচারের জন্য লড়ে যান, তাহলে কেবল অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রভাবশালী বা অর্থশালী হওয়ার কারণে সেই নারী ও তার সন্তানকে বছরের পর বছর ভোগান্তির মধ্যে থাকতে হবে কেন? দেশে উঠতি শিল্পপতি কিংবা ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নারীদের শোষণ, প্রতারণা, মিথ্যা বিয়ের প্রলোভন, যৌন হয়রানি কিংবা সম্পর্কের নামে প্রতারণার অভিযোগ উঠলে তার সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার কোথায়? একজন নারীর সম্মান, একজন শিশুর পরিচয় এবং একজন বিচারপ্রার্থীর ন্যায়বিচারের অধিকার কি কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়, অর্থের প্রভাব কিংবা ক্ষমতার কাছে দুর্বল হয়ে যাবে?

এই প্রশ্ন শুধু একজন নারীর নয়—এটি এমন প্রতিটি নারীর প্রশ্ন, যারা প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, সামাজিক চাপ ও ক্ষমতার প্রভাবের কাছে নিজেদের অসহায় মনে করেন।

Related News :

রাজধানীতে ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতিতে বাস পরিচালনা কার্যক্রমের উদ্বোধন

রাজধানীতে ফ্র্যাঞ্চাইজ পদ্ধতিতে বাস পরিচালনা কার্যক্রমের উদ্বোধন

পিএসসির নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন জাবি অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা

পিএসসির নতুন সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন জাবি অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষ, পুলিশের গাড়িতে আগুন

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু : ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর

তাহসিফের রহস্যজনক মৃত্যু : ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর

তাহসিফ সৌরির ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে হেফাজতে নিয়েছে পিআইবি

তাহসিফ সৌরির ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপকে হেফাজতে নিয়েছে পিআইবি

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে হানি ট্র্যাপ চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার

রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে হানি ট্র্যাপ চক্রের দুই সদস্য গ্রেপ্তার

রাজধানীতে চীনে পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা ১২ পাহাড়ি নারী উদ্ধার

রাজধানীতে চীনে পাচারের উদ্দেশ্যে আটকে রাখা ১২ পাহাড়ি নারী উদ্ধার

মিরপুরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ডিএনসিসির অভিযান

মিরপুরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ডিএনসিসির অভিযান

মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর সঙ্গে জামায়াত নেতার আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল

মাদারীপুরের শিবচরে এক নারীর সঙ্গে জামায়াত নেতার আপত্তিকর ভিডিও ভাইরাল

মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও দাফনে বাধার প্রতিবাদে জাবিতে শিক্ষার্থীদের মোমবাতি...

মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ও দাফনে বাধার প্রতিবাদে জাবিতে শিক্ষার্থীদের মোমবাতি...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
×