ঢাকা, ২৭ জুন-২০২৬
ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার পথের বাজার এলাকায় এখনও শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করে টিকে আছে সনাতন ধর্মাবলম্বী ঋষি সম্প্রদায়ের বাঁশশিল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁশের তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন এই সম্প্রদায়ের মানুষ। তবে কাঁচামালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এক সময়ের সমৃদ্ধ এই কুটিরশিল্প আজ অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
উপজেলার দিঘলিয়া ইউনিয়নের পথের বাজার সংলগ্ন পানিগাতী গ্রামে ঋষি সম্প্রদায়ের ৩৬টি পরিবারে প্রায় ২০০ মানুষের বসবাস। শত শত বছর ধরে তারা বংশানুক্রমে বাঁশশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। পরিবারের নারী-পুরুষ সবাই কোনো না কোনোভাবে এই পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একসময় এই শিল্পই ছিল তাদের প্রধান আয়ের উৎস। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বিকল্প পণ্যের প্রসারে তাদের তৈরি বাঁশের সামগ্রীর চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে।
সেনহাটি ইউনিয়নের পথের বাজার রোডের বাসিন্দা পরিতোষ দাস (৪৫) জানান, ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বাঁশের কাজ শিখেছেন। বর্তমানে পরিবার নিয়ে এই পেশার ওপরই নির্ভরশীল। তিনি বলেন, ‘আগে একটি বাঁশের দাম অনেক কম ছিল। এখন বাঁশ কিনতেই অনেক বেশি টাকা লাগে। সেই সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের দামে পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’
একই এলাকার প্রবীণ কারিগর খোকন চন্দ্র দাস (৬৫) বলেন, ‘এই বাঁশশিল্প শুধু আমাদের জীবিকার উৎস নয়, এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য। একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহার হতো। এখন প্লাস্টিকের পণ্যের কারণে মানুষ বাঁশের জিনিস খুব কম কিনছে। ফলে আয় কমে গেছে, সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
স্থানীয় কারিগররা জানান, তারা এখনও হাতে তৈরি করছেন মুরগির খাঁচা, কাঁচা আড়ত থেকে মালামাল বহনের ঝুড়ি, খেজুর গাছে ওঠার সময় যন্ত্রপাতি রাখার ঝুড়ি, মাছ বহনের খারই, ডুলা, মোড়া, পাখির খাঁচাসহ কৃষিকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের উপকরণ। এসব পণ্য পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলেও আধুনিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে এর ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে।
কারিগরদের অভিযোগ, কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত বাঁশের দাম গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ক্রেতা বাড়েনি। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে অনেক ক্রেতাই প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।
স্থানীয়দের মতে, একসময় দিঘলিয়ার পথের বাজার ছিল বাঁশের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীর জন্য সুপরিচিত। আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকেও মানুষ এখানে এসে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র কিনতেন। বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন। কারণ এই পেশায় পর্যাপ্ত আয় না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁশশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও পরিবেশবান্ধব কুটিরশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক নকশা উদ্ভাবন, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
বাঁশশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা সরকারের কাছে সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা, প্রশিক্ষণ, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশা, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে শতবর্ষের এই ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পাবে এবং এর সঙ্গে জড়িত শতাধিক মানুষের জীবিকা সুরক্ষিত হবে।
Related News :

খুলনা বিভাগে নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনারদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

খুলনায় নদীতে ভাসমান দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ


