ঢাকা, ১৯ মার্চ-২০২৬
ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : খুলনার দিঘলিয়া উপজেলা ও মহানগরীর দৌলতপুরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা ভৈরব নদী শুধু ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি দুই পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। নদীর একপারে দৌলতপুর খেয়াঘাট এবং অপর পারে দেয়াড়া খেয়াঘাট—এই দুই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবিকার তাগিদে, ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পারাপার হয়ে থাকেন। এই ব্যস্ত যাতায়াতের মাঝেই চোখে পড়ে আরেকটি নীরব বাস্তবতা—ঘাটের দুই পাড়ে বসে থাকা অসহায় ভিক্ষুকদের দীর্ঘ সারি। কেউ ল্যাংড়া, কেউ কানা, কেউ খোঁড়া, আবার কেউ বোবা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাদের জীবনের পথকে করেছে আরও কঠিন ও অনিশ্চিত। কাজ করার সক্ষমতা না থাকায় ভিক্ষাবৃত্তিই তাদের একমাত্র জীবিকা। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘাটে বসে মানুষের কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়ান তারা। কেউ দয়া করে কিছু দেন, আবার অনেকেই মুখ ফিরিয়ে চলে যান। যে সামান্য অর্থ তারা পান, তা দিয়ে কোনোভাবে দিন চলে গেলেও তিনবেলা পেট ভরে খাওয়া কিংবা চিকিৎসা, বাসস্থান, পোশাকের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব।
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে যখন চারদিকে আনন্দের আমেজ, নতুন পোশাক কেনা আর পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির প্রস্তুতি, তখন এই মানুষগুলোর চোখে থাকে অন্যরকম এক প্রত্যাশা। তারা আশা করেন, অন্তত ঈদের সময় মানুষ একটু বেশি সহানুভূতিশীল হবে, একটু বেশি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে। দৌলতপুর বাজারে এখন উপচে পড়া ভিড়। ক্রেতাদের হাতে শপিং ব্যাগ, নতুন জামা-জুতা, ঈদের কেনাকাটার উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দে মেতে উঠতে প্রস্তুত সবাই। কিন্তু ঘাটের পাশে বসে থাকা সেই ভিক্ষুকদের জন্য ঈদ মানে কেবলই আরেকটি দিন, যেখানে বেঁচে থাকার সংগ্রামই প্রধান বাস্তবতা।
ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে এই চিত্র আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে। ইসলাম ধর্মে দান-সদকা, যাকাত ও ফিতরার গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কোরআনে বারবার অসহায়, এতিম ও মিসকিনদের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার পাশের প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ ঈদুল ফিতরের অন্যতম শিক্ষা হলো—সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যে সুখ-সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। যাকাত ও সদকাতুল ফিতর প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্যই হলো, ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে এনে সবাইকে ঈদের আনন্দে শামিল করা। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ এখনো সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত।
দৌলতপুর খেয়াঘাটের এই ভিক্ষুকরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের দুঃখ-দুর্দশা শুধুমাত্র তাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। আমরা যদি ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী আন্তরিকভাবে যাকাত, ফিতরা ও সদকা আদায় করি এবং তা সঠিকভাবে বিতরণ নিশ্চিত করি, তাহলে অন্তত এই মানুষগুলোর কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন বিজ্ঞজনেরা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে—দান যেন শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে প্রকৃত প্রয়োজনমতো মানুষের কাছে পৌঁছায়। ঈদের আনন্দ তখনই পরিপূর্ণ হবে, যখন সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সেই আনন্দে শামিল হতে পারবে। ভৈরব নদীর খেয়াঘাটে বসে থাকা এই অসহায় মানুষগুলোর মুখে একটুখানি হাসি ফোটানোই হতে পারে আমাদের জন্য প্রকৃত ঈদের সার্থকতা। সবশেষে প্রশ্ন থেকে যায়—ঈদের এই আনন্দ কি শুধুই সামর্থ্যবানদের জন্য? নাকি এটি এমন এক উৎসব, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ সমানভাবে অংশগ্রহণের অধিকার রাখে? ভৈরব নদীর খেয়াঘাটের দুই পাড়ে বসে থাকা এই ভিক্ষুকরা কোনো ভিন্ন জগতের মানুষ নয়; তারা আমাদেরই সমাজের অবহেলিত অংশ। তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো, তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধুমাত্র মানবিক দায়িত্ব নয়—এটি একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের ঈমানেরও অংশ।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, সমাজে কেউ অভুক্ত থাকবে আর কেউ বিলাসিতায় মত্ত থাকবে—এটি কখনোই কাম্য নয়। তাই আসুন, ঈদের এই মুহূর্তে আমরা কেবল নিজের পরিবার নয়, আশপাশের অসহায় মানুষগুলোর দিকেও দৃষ্টি দিই। আমাদের সামান্য সহায়তাও তাদের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং সচেতন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান—আপনারা এগিয়ে আসুন। পরিকল্পিতভাবে এইসব অসহায় মানুষের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করুন, যেন তারা অন্তত ঈদের দিনে একটু ভালোভাবে খেতে পারে, পরতে পারে, এবং নিজেদের মানুষ হিসেবে অনুভব করতে পারে। কারণ, প্রকৃত ঈদ সেইটাই—যেখানে আনন্দ ভাগাভাগি হয়, দুঃখ লাঘব হয়, আর মানুষের মাঝে মানবিকতার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
Related News :

খুলনা বিভাগে নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনারদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

খুলনায় নদীতে ভাসমান দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ


