ঢাকা, ২০ নভেম্বর-২০২৫
ইঞ্জিনিয়ার ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : শীতের আগমনী মুহূর্ত যেন প্রকৃতির এক নীরব উৎসব, যেখানে কুয়াশা, আলো আর হিমেল হাওয়া একসঙ্গে মিলে বুনে চলে ঋতুর নতুন গল্প। খুলনার দিঘলিয়ার মাঠ-ঘাটে শীতের চাদর নামতে শুরু করেছে। ভোরের কুয়াশা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। অথচ একসময় এ সময়টাতেই গ্রামের আকাশ-বাতাস ভরিয়ে রাখত খেজুর রসের মিষ্টি ঘ্রাণ। উঠোনে ধোঁয়া উঠত তালের চুলায় ফুটতে থাকা গুড়ের হাঁড়ি থেকে। খেজুর রসের পিঠা-পুলির স্বাদে জেগে উঠত গ্রামীণ জীবনমান। কিন্তু আজ সেই রূপকথার মতো দৃশ্য অতীত হয়ে যাচ্ছে-কমেছে খেজুর গাছ, হারিয়ে যাচ্ছে গাছিও।
গাছ কমেছে, গাছিও নেই- ঐতিহ্য তাই হারানোর পথে :
স্থানীয় প্রবীণরা জানান, দিঘলিয়ার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই আগে শত শত খেজুরগাছ দেখা যেত। শীতের রাতে গাছিরা কাঠালির আলো জ্বেলে গাছে উঠতেন রসের হাঁড়ি বসাতে। সকালে হাঁড়ি নামানোর শব্দে গ্রামের পথ জেগে উঠত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না বললেই চলে। কৃষিজমি পুনর্বিন্যাস, বসতি গড়ে ওঠা, জমিতে বাণিজ্যিক গাছ লাগানোর প্রবণতা-সব মিলিয়ে খেজুরগাছের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্ম গাছি পেশাকে আর গ্রহণ করছে না। ফলে পেশাগত সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
চাহিদা বাড়লেও সরবরাহে ভাঙন :
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, দিঘলিয়া উপজেলা ও আশপাশের হাট-বাজারে খেজুর রস, পাটালি ও গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষত শীতকালে খাঁটি পাটালির জন্য মানুষের আগ্রহ এখনো আগের মতোই। তবে গাছ কমে যাওয়া এবং গাছির সংকটের কারণে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে চাহিদা থাকলেও সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজার সঙ্কুচিত হচ্ছে, বাড়ছে ভেজালের ঝুঁকিও।
কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ :
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কিশোর আহমেদ বলেন, ‘এখনই সময় ঐতিহ্য রক্ষার।’ ‘খেজুর রস ও গুড় গ্রামীণ ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জমির আইলে এবং পতিত জমিতে খেজুরগাছ লাগানো বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গাছি পেশাকে উৎসাহ দিতে প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা উপকরণ ও সহজ ঋণ সুবিধা দিলে গাছিরা আবার এই পেশায় ফিরতে আগ্রহী হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যদি পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে দিঘলিয়ার শীতের সকাল আবারও ভরবে খেজুর রসের ঘ্রাণে, আর পিঠা-পুলির ধোঁয়ায় উঠোন হবে সরগরম। এতে শুধু ঐতিহ্যই বাঁচবে না-গ্রামীণ অর্থনীতিতেও যোগ হবে নতুন গতি।’ এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দিঘলিয়ার খেজুর রস শিল্প আবার প্রাণ ফিরে পেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ইউএনওর মন্তব্য :
দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ বলেন, ‘ঐতিহ্য হারালে সংস্কৃতির শেকড় দুর্বল হয়।’ ‘গ্রামীণ ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির শেকড়। আধুনিকতার দৌড়ে এসব ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু খেজুর রস নয়-মৃৎশিল্প, বাঁশশিল্প, লোকজ পিঠা-সবকিছু টিকিয়ে রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যাতে নতুন প্রজন্ম নিজেদের শেকড় চিনতে পারে, গর্ব করতে পারে।’
শেষকথা :
দিঘলিয়ার খেজুর রস-এ শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি গ্রামবাংলার শীতের আনন্দ, সংস্কৃতি ও রসনাবিলাসের চিরচেনা প্রতীক। এখনই সচেতন না হলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে সময়ের নীরব স্রোতে। সমন্বিত উদ্যোগ, নতুন গাছ লাগানো এবং গাছিদের উৎসাহ-এই তিন মিললেই দিঘলিয়ার শীত আবার ফিরে পাবে অতীতের সেই মিষ্টি সুরভী।
Related News :

খুলনা বিভাগে নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনারদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

খুলনায় নদীতে ভাসমান দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ


