ঢাকা, ১৬ জুন-২০২৬
ওয়াহিদ মুরাদ, (খুলনা ব্যুরো চীফ) : খুলনার দিঘলিয়াবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্প নানা জটিলতায় পড়ে কার্যত ধীরগতির শিকার হয়েছে। নকশা পরিবর্তন, জমি অধিগ্রহণের জটিলতা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রশাসনিক সমস্যার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ২০২১ সালের ২৪ মে দিঘলিয়া প্রান্তে সরকারি খাস জমিতে টেস্ট পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্প শুরুর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ মাত্র। ফলে মহানগরী খুলনার সঙ্গে দিঘলিয়া উপজেলা এবং নড়াইল, গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বহু প্রতীক্ষিত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ কবে চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
সেতুর নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ফেরিঘাটে দীর্ঘ অপেক্ষা, যানজট ও সময় অপচয়ের শিকার হচ্ছেন। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী এবং রোগী পরিবহনে দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের অগ্রগতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় জনভোগান্তি দিন দিন বাড়ছে, অথচ দৃশ্যমান সমাধান মিলছে না। স্থানীয় বাসিন্দারা দল-মত নির্বিশেষে দ্রুত ভৈরব সেতুর নির্মাণ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সেতুটি চালু হলে কৃষিনির্ভর দিঘলিয়াসহ ভৈরব নদীর পূর্বপারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে। পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে এবং এ অঞ্চলে নতুন বাণিজ্যিক জোন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুলনা মহানগরীর সঙ্গে দিঘলিয়া, কালিয়া, নড়াইল ও গোপালগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার যোগাযোগ সহজ করতে ভৈরব নদীর ওপর সেতু নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘ভৈরব সেতু’ প্রকল্প অনুমোদন লাভ করে। ১ দশমিক ৩১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুর নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণে ৩০৩ কোটি টাকা, জমি অধিগ্রহণে ২৮১ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট অর্থ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। ২০২০ সালের ২৭ জুলাই সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) নির্মাণকাজের দরপত্র আহ্বান করে। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে মেসার্স ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড (করিম গ্রুপ) প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায়। তবে জমি অধিগ্রহণ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০২১ সালের ২৪ মে দিঘলিয়া প্রান্তে সরকারি খাস জমিতে টেস্ট পাইলিংয়ের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
প্রকৌশলী সূত্রে জানা গেছে, সংশোধিত নকশা অনুযায়ী সেতুটি ২৯টি পিলারের ওপর নির্মিত হবে। ইতোমধ্যে দিঘলিয়া অংশের অধিকাংশ পিলারের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে খুলনা শহরাংশের রেলিগেট এলাকায় কিছু পিলারের ঢালাই কাজ চললেও সামগ্রিক অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। জমি হস্তান্তর ও রেলওয়ের জায়গা সংক্রান্ত জটিলতার কারণে ওই অংশে কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি। সংশোধিত নকশায় সেতুর কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। পূর্বের কংক্রিট ডিজাইনের পরিবর্তে এটি এখন ঢাকার হাতিরঝিল বা কালনা সেতুর আদলে আর্চ টাইপ স্টিল স্প্যান দিয়ে নির্মিত হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে মূল স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬০ মিটার করা হয়েছে, যাতে নদীর মাঝখানে কোনো পিলার না থাকে। একই সঙ্গে সেতুর প্রস্থ ৭ দশমিক ৩ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১০ দশমিক ৩ মিটার করা হয়েছে এবং ভ্যান, রিকশা ও ইজিবাইক চলাচলের জন্য পৃথক স্বল্পগতির সার্ভিস লেন যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি পিলারে আরসিসির পরিবর্তে স্টিল গার্ডার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দিঘলিয়া অংশে জমি অধিগ্রহণ এবং বিদ্যুতের খুঁটি স্থানান্তরের কাজ শেষ হলেও খুলনা শহরাংশে রেলওয়ের জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্মাণকাজের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মেলেনি। প্রকল্প বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে তিন দফা সময় বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে অতীতের ধীরগতির অভিজ্ঞতা এবং বিদ্যমান জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও সংশয় কাটেনি।
২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বহুল প্রতীক্ষিত ‘ভৈরব সেতু’ প্রকল্প অনুমোদনের পর কেটে গেছে দীর্ঘ ছয়টি বছর। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনও বাস্তবের মুখ দেখেনি। এ সময়ের মধ্যে দিঘলিয়ার কয়েকশ মানুষ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই শেষ জীবনের একটি বড় আক্ষেপ ছিল—জীবদ্দশায় প্রিয় খুলনা শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপনকারী স্বপ্নের ভৈরব সেতু নিজের চোখে দেখে যেতে না পারা। স্থানীয় প্রবীণদের মুখে আজও শোনা যায় সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প, যেখানে উন্নয়নের আশায় বুক বাঁধা মানুষের স্বপ্ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপূর্ণই থেকে গেছে। তাই ভৈরব সেতু এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, এটি হাজারো মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত এক স্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, আর যেন কোনো মানুষের এই স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে না হয়।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত সব প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে নির্মাণকাজে গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় খুলনা ও ভৈরব নদীর দিঘলিয়াপারের লাখো মানুষের বহু প্রতীক্ষিত এই স্বপ্নের সেতু আরও দীর্ঘ সময় ধরে অপূর্ণ থেকে যাবে এবং জনদুর্ভোগও অব্যাহত থাকবে।
Related News :

খুলনা বিভাগে নবযোগদানকৃত সহকারী কমিশনারদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত

খুলনায় নদীতে ভাসমান দুই যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার

তেরখাদায় বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় যুব দিবস-২০২৬ উদযাপিত

বর্ণাঢ্য আয়োজনে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় জাতীয় যুব দিবস পালিত

দিঘলিয়ায় এইচএসসিতে পাসের হার ২৯.০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ জন

বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস-২০২৬ উপলক্ষে দিঘলিয়ায় বর্ণাঢ্য র্যালি ও হাত ধোয়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

খুলনায় বিভাগীয় বইমেলা শুরু ১০ নভেম্বর

ইউএনও'র তত্ত্বাবধায়নে নব উদ্যোগে এগিয়ে চলছে পাইকগাছা পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সেবা

খুলনার দিঘলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত, বাল্যবিবাহ, ডেঙ্গু ও মাদক নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বারোপ


