দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিনের দানকৃত সম্পত্তি দেশের শিক্ষা ও ঐতিহ্যের ভিত্তি

ঢাকা, ০২ মে-২০২৬ 

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে উপমহাদেশের অন্যতম দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিনের দানকৃত বিপুল সম্পত্তি, যা এখনো শিক্ষা, ধর্মীয় ও সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরাসহ দেশের নানা স্থানে তার দানকৃত ভূমি ও স্থাপনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সক্রিয় রয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের লিখিত উত্তরে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, হাজী মহসিনের দানকৃত সম্পত্তির একটি বড় অংশ এখনো শিক্ষা ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমও চলছে।

ঢাকায় মহসিন ফান্ডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত মোহসিনিয়া মাদ্রাসা পরবর্তীতে ‘ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। সময়ের বিবর্তনে এই প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে এর স্থানে গড়ে ওঠে ঢাকা গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল, ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং হাজারো শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রদান করছে।

চট্টগ্রামে হাজী মহসিনের দানকৃত জমিতে ১৮৭৪ সালের ২০ জুলাই মহসিন তহবিলের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয় মহসিনিয়া মাদ্রাসা। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে মাদ্রাসা পদ্ধতি বিলুপ্ত করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ সাধারণ বিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হয় এবং নামকরণ করা হয় ‘হাজী মুহাম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’। একইসঙ্গে মাদ্রাসার উচ্চতর অংশটি ১৯২৭ সালে ‘চট্টগ্রাম ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ’ হিসেবে স্বতন্ত্র কার্যক্রম শুরু করে। পরে ১৯৭৯ সালে পার্শ্ববর্তী সরকারি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সঙ্গে একীভূত হয়ে প্রায় ৩০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, যা বর্তমানে দেশের একটি মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। উল্লিখিত জমিগুলো বাকলিয়া সার্কেলের কাসিম বাজার ও রহমতগঞ্জ মৌজায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে।

খুলনা জেলায় হাজী মহসিনের দানকৃত সম্পত্তির ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট। এই ট্রাস্টের আওতাভুক্ত সম্পত্তিসমূহ জেলা প্রশাসক, খুলনার নামে রেকর্ডভুক্ত এবং জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে গঠিত কমিটি ট্রাস্টের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অবৈধ দখলে চলে যাওয়া সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য ইতোমধ্যে আইনজীবী নিয়োগ করে দেওয়ানি মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ট্রাস্টের আওতাধীন সম্পত্তিগুলো জেলা, উপজেলা, মৌজা, দাগ ও খতিয়ান অনুযায়ী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ এবং সরকারি গেজেট প্রকাশের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

যশোর জেলার সদর উপজেলার ৮৩ নম্বর মুরলী মৌজায় আরএস ৮ নম্বর খতিয়ানে ৩.৭৯৭৬ একর জমি দানবীর হাজী মহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। এই জমিতে বিদ্যালয় ভবন, খেলার মাঠ, পুকুর এবং কিছু দোকানঘর রয়েছে, যা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে। একই উপজেলার আরএস ১ নম্বর খতিয়ানে ০.৭৫৩৭ একর জমি কালেক্টর, যশোরের নামে রেকর্ডভুক্ত, যা ‘ইমামবাড়া’ নামে পরিচিত। এই স্থাপনাটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, কবরস্থান, পরিত্যক্ত স্কুল, ডোবা ও প্রত্নতাত্ত্বিক কার্যালয় বিদ্যমান। এ ছাড়া যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার সৃজাপুর মৌজায় ২৯৯ নম্বর খতিয়ানে মোট ১১.১২০০ একর জমি সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের পক্ষে কালেক্টর যশোরের নামে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে, যা বর্তমানে খান জাহান আলী দীঘির পাড় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সাতক্ষীরা জেলায়ও হাজী মহসিনের দানকৃত সম্পত্তির অস্তিত্ব রয়েছে, যা সৈয়দপুর ট্রাস্টের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং খুলনা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ডব্লিউ. এম. ক্লে. কালেক্টর খুলনা কর্তৃক সংকলিত ‘নোটস অন দি মহসিন এনডাউমেন্ট সেডপুর ট্রাস্ট স্টেট’ গ্রন্থ অনুযায়ী, আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার অন্তত সাতটি মৌজায় এই সম্পত্তির অবস্থান রয়েছে। আশাশুনি উপজেলার ঝিকরা মৌজায় এসএ খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত জমি আরএস জরিপে খাল শ্রেণির জমি হিসেবে ট্রাস্টের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়েছে, যার পরিমাণ ২৬.৫২ একর। কালিগঞ্জ উপজেলার সাইহাটি মৌজার গুতিয়াখালি খাল, যার পরিমাণ ৪.৮৯ একর, এটি পূর্বে ট্রাস্টের সম্পত্তি ছিল এবং বর্তমানে তা জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ঝিকরা মৌজার খালটি ট্রাস্ট কর্তৃক ইজারা প্রদান করা হয়েছে।

সরকারি উদ্যোগে এসব সম্পত্তির পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার তৈরির কাজ চলমান রয়েছে। এসএ ও আরএস খতিয়ান যাচাই-বাছাই করে সাতক্ষীরাসহ সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর জমির সঠিক হিসাব সংরক্ষণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে এই ঐতিহাসিক দানসম্পদের সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Related News :

নিবন্ধন-ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া সড়কে কোন ই-রিক্সা চলবে না : এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী

নিবন্ধন-ফিটনেস সার্টিফিকেট ছাড়া সড়কে কোন ই-রিক্সা চলবে না : এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী

বাংলা কিউআরভিত্তিক ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেন সেবা চালু

বাংলা কিউআরভিত্তিক ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি লেনদেন সেবা চালু

ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২,২১৮

ডেঙ্গুতে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২,২১৮

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০২৭ : আবেদন পাঠানোর সময়সীমা বাড়ল

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক-২০২৭ : আবেদন পাঠানোর সময়সীমা বাড়ল

নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

অবৈধ মোবাইল ফোনে রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে চালু হচ্ছে এনইআইআর

অবৈধ মোবাইল ফোনে রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে চালু হচ্ছে এনইআইআর

প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা

প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা

সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৭ দিন বন্ধ থাকবে অনলাইন জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম

সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৭ দিন বন্ধ থাকবে অনলাইন জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রমে গতি আনতে চেয়ারম্যানের নির্দেশনা বাস্তবায়নের তাগিদ

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যক্রমে গতি আনতে চেয়ারম্যানের নির্দেশনা বাস্তবায়নের তাগিদ

জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য : নবনিযুক্ত প্রধান তথ্য কমিশনার

জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করাই প্রধান লক্ষ্য : নবনিযুক্ত প্রধান তথ্য কমিশনার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
×