অপ্রিয় সত্য ঘটনার অসাধারণ আত্মপ্রকাশ

ঢাকা, ০৭ মার্চ-২০২৬

বিশেষ প্রতিবেদন : চাকরি করতে গিয়ে এক নারী প্রথমে লোলুপ দৃষ্টি, অশালীন ইঙ্গিত আর লালসার প্রস্তাবের শিকার হন। তিনি বারবার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তার এই ‘না’ যেন এক বিকৃত অহংকারকে আরও উন্মত্ত করে তোলে। বিবাহিত হয়েও সেই ব্যক্তি তাকে বারবার প্রেমের প্রস্তাব দিতে থাকে, আর প্রতিবারই প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তাকে জোরপূর্বক শারীরিক নির্যাতনের শিকার করা হয়। এরপর তার অসহায় অবস্থাকে পুঁজি করে বারবার জোর করে সেই সম্পর্ক চালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।

একসময় তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েন। তখন তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখানো হয়, আশ্বাস দেওয়া হয়-‘সঠিক সময় হলে সবকিছু ঠিক করা হবে, তোমাকে ও তোমার সন্তানকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে।’ নিজের জীবন আর গর্ভের সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি নীরবতা বেছে নেন, অপেক্ষা করেন-একটা নিরাপদ সময়ের, একটা ন্যায্য স্বীকৃতির। কিন্তু সেই অপেক্ষার আড়ালে ছিল প্রতারণা।

যখন তিনি নিজের ও তার সন্তানের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আইনের দ্বারস্থ হন, তখন শুরু হয় আরেক নির্মম যুদ্ধ-ক্ষমতা, রাজনীতি আর টাকার নগ্ন প্রদর্শন। একের পর এক ষড়যন্ত্র, প্রাণনাশের হুমকি, এমনকি হত্যাচেষ্টার ঘটনাও ঘটে। মামলাটি শুরু হয়েছিল যখন শিশুটির বয়স ছিল মাত্র ১৩ মাস; আজ সেই শিশুর বয়স প্রায় সাড়ে তিন বছর। এই সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছয় মাস কারাগারে থেকেও অবৈধ উপায়ে জামিন নিয়ে বের হয়ে আসে, এবং তারপর থেকে দিনকে দিন ক্ষমতা ও টাকার খেলায় নতুন নতুন ষড়যন্ত্র বুনে চলেছে। মামলাটি স্থগিত করানোর জন্যও চরম ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি এক পর্যায়ে নিজেদের দায় এড়ানোর জন্য তারা বারবার সেই সন্তানকেই অস্বীকার করেছে। অথচ আজ সেই একই সন্তানকেই তারা নিজেদের মুক্তির পথ খোঁজার এক মোহরা হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। তারা সন্তানের ভরণ-পোষণ দিতে রাজি, এমনকি সন্তানকে নিজেদের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলে-কিন্তু সেই সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতি দিতে আজও প্রস্তুত নয়।

যে নারী ও যে শিশুকে একদিন সমাজের সামনে অপমানিত ও অসহায় করে তোলা হয়েছিল, সেই অন্যায়ের জন্য তাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই; বরং আজও আইনকে দাবা খেলার গুটির মতো ব্যবহার করে ক্ষমতা ও টাকার দম্ভে সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। অথচ এই সন্তানকে তার মা জন্ম দেওয়ার পর গত সাড়ে তিন বছর ধরে নিজের একার শক্তিতে লালন-পালন করেছেন, প্রতিদিন তার প্রয়োজন পূরণ করেছেন, তার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিজের উপার্জন ও পরিশ্রমের অর্থ দিয়ে নিশ্চিত করেছেন যেন তার বেড়ে ওঠা সুন্দর ও স্বাভাবিক হয়। সেই সন্তান তার বাবাকে কোনোদিন অনুভবই করেনি; তার ছোট্ট পৃথিবীতে শুধু একজন মানুষই আছে-তার মা। সেই মাকেই সে তার মা এবং বাবার জায়গায় জানে ও চিনে। তার পৃথিবীতে এই একজন মানুষই সবকিছু।

অথচ আজ সাড়ে তিন বছর পর হঠাৎ করেই তাকে তার বাবার ক্ষমতার নতুন এক প্রলোভনের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে-বলা হচ্ছে তাকে নাকি তার অন্য তিন সন্তানের মতো বিলাসবহুল জীবন দেওয়া হবে, তাদের মতোই বড় করা হবে; শুধু সন্তানটিকে দিয়ে দিলেই হবে, তার সব দায়িত্ব তারা নেবে। যেন একটি শিশুর পরিচয়, অনুভূতি, তার মায়ের সঙ্গে তার অস্তিত্বের বন্ধন-সবকিছুই শুধু ক্ষমতা ও টাকার খেলায় ব্যবহারযোগ্য একটি বস্তু। তবুও সেই মা থেমে যাননি। প্রায় তিন বছর ধরে তিনি লড়ে যাচ্ছেন-একজন মায়ের অদম্য শক্তি নিয়ে, নিজের সন্তানের ন্যায্য অধিকার, পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। সমাজের ভয়, ক্ষমতার দাপট, অসংখ্য ষড়যন্ত্র-কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

তার এই লড়াই আজ পৌঁছে গেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায়। দিনরাত নিজের সবটুকু শক্তি, সাহস আর বিশ্বাস নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন-শুধু একজন মা হিসেবে, তার সন্তানের ন্যায্য পরিচয়, মর্যাদা ও অধিকার ছিনিয়ে আনার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
×