ঢাকা, ১৫ অক্টোবর-২০২৬
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক : বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, অর্থপাচার ও উদীয়মান নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি বৃদ্ধির অঙ্গীকার করে দিল্লি ঘোষণা গ্রহণ করেছেন বিমসটেকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা। গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে বঙ্গোপসাগরীয় বহুমাত্রিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগের (বিমসটেক) প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ ঘোষণা গ্রহণ করা হয়। আজ ১৫ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) বিমসটেক সচিবালয়ের প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ জোরদারের একটি সমন্বিত কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ, সহিংস উগ্রবাদ, সাইবার অপরাধ, অবৈধ মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন, আর্থিক অপরাধ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার হুমকি মোকাবিলা।
ঘোষণায় মানবপাচারের নতুন ধরনের ঘটনা মোকাবিলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনায় অপরাধী চক্র ভুক্তভোগীদের অনলাইন জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক কার্যক্রমে জোরপূর্বক অংশ নিতে বাধ্য করে। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড— এই সাতটি দেশ নিয়ে বিমসটেক গঠিত।
ঘোষণা অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও সমন্বিত নিরাপত্তা উদ্যোগের মাধ্যমে একটি সংযুক্ত, নিরাপদ, সহনশীল, উন্নত ও সমৃদ্ধ বিমসটেক অঞ্চল গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদসহ সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের তীব্র নিন্দা জানান এবং জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এসব হুমকি মোকাবিলায় তাদের দৃঢ় সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেন। মন্ত্রীরা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে ১২৬৭ নিষেধাজ্ঞা কমিটির আওতায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান।
আন্তঃদেশীয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের বিষয়টি স্বীকার করে ঘোষণায় অনলাইন প্রতারণামূলক কার্যক্রম, ঋণদাসত্ব ও অন্যান্য ধরনের শোষণে মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের জোরপূর্বক নিয়োজিত করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রীরা মানবপাচার মোকাবিলায় উৎস, ট্রানজিট ও গন্তব্য দেশগুলোর পাশাপাশি যেসব দেশে প্রতারণাকেন্দ্র পরিচালিত হয় এবং যেসব দেশের নাগরিকরা প্রতারণার শিকার হন, সেসব দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন। তারা মানবপাচার মোকাবিলায় ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক পদ্ধতি অনুসরণের আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহযোগিতা জোরদারের কথা বলা হয়।
একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা মানবপাচারবিরোধী বিমসটেক কনভেনশনের খসড়া অনুমোদন করেন। সদস্য দেশগুলোর প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এটি স্বাক্ষরিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তারা মানবপাচারবিরোধী একটি আঞ্চলিক কর্মপরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়ন সহজতর করতে একটি বাস্তবায়ন কাঠামোও অনুমোদন করেন। এর লক্ষ্য মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
ঘোষণায় মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার, প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনের জন্য আদর্শ কার্যপদ্ধতি দ্রুত চূড়ান্ত করার আহ্বান জানানো হয়। এছাড়া মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান মোকাবিলায় একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা নিয়ে আরও আলোচনার উৎসাহ দেওয়া হয়। আর্থিক অপরাধ মোকাবিলার ক্ষেত্রে মন্ত্রীরা অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সক্ষমতা বৃদ্ধি বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক অনুমোদন করেন। প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এটি স্বাক্ষর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তারা বিমসটেক সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অবৈধ অর্থপ্রবাহ প্রতিরোধে একটি কর্মপরিকল্পনাও অনুমোদন করেন। এর লক্ষ্য অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যাতে আর্থিক ব্যবস্থা ও উদীয়মান প্রযুক্তির অপব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য আন্তর্জাতিকভাবে সম্মত মানদণ্ড বাস্তবায়নের গুরুত্ব ঘোষণায় তুলে ধরা হয়। এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিংয়ের (এপিজি) পর্যবেক্ষক হিসেবে বিমসটেকের মর্যাদা লাভকে স্বাগত জানান মন্ত্রীরা। তারা এটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও জোরালো সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মাদকদ্রব্যের বিষয়ে বৈঠকে বিমসটেকের মাদক নিয়ন্ত্রণবিষয়ক কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। পাশাপাশি বিমসটেকের বার্ষিক মাদক প্রতিবেদনগুলোর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের অনুমোদন দেওয়া হয়। মন্ত্রীরা মাদকসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় ও আঞ্চলিক পদক্ষেপ জোরদার করতে একটি বিমসটেক মাদক অপরাধ পর্যবেক্ষণ ডেস্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও স্বীকার করেন। তারা বাস্তবায়ন কাঠামোসহ উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কর্মপরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান।
আইনি সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধ ও অবৈধ মাদক পাচার মোকাবিলায় বিমসটেক কনভেনশন সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০২১ সালের মার্চে কনভেনশনটি কার্যকর হয়। মন্ত্রীরা ২০২২ সালের মার্চে কলম্বোয় অনুষ্ঠিত পঞ্চম বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তাবিষয়ক বিমসটেক কনভেনশন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান।
আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে প্রত্যর্পণ এবং দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হস্তান্তরবিষয়ক প্রস্তাবিত কনভেনশনগুলো দ্রুত চূড়ান্ত করারও আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিমসটেকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট প্রধানদের অগ্রগতির বিষয়টি স্বীকার করা হয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিমসটেকের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট প্রধানদের পঞ্চম বৈঠকে সামুদ্রিক মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলার নির্দেশিকা এবং সামুদ্রিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য নির্দেশক নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। বিমসটেকের প্রথম সামুদ্রিক নিরাপত্তা মহড়া চলতি বছরের ৩০ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার কর্মসূচিতে সাইবার নিরাপত্তাও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ন্যাশনাল কম্পিউটার ইনসিডেন্ট রেসপন্স টিমগুলোর মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা চলছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি ও সমন্বয় উন্নত করার কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করেন। এই উদ্যোগের লক্ষ্য বিমসটেক সদস্য দেশগুলোকে প্রভাবিত করা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আঞ্চলিক প্রস্তুতি, আগাম সতর্কীকরণ সক্ষমতা এবং সমন্বিত সাড়াদান ব্যবস্থা জোরদার করা।
ঘোষণায় আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা কর্মীদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচির গুরুত্বও স্বীকার করা হয়। সদস্য দেশগুলো সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, মানবপাচার প্রতিরোধ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং অন্যান্য আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় নিজ নিজ দেশের প্রধান প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়ার অঙ্গীকার করে।
ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার বাস্তবায়ন তদারকির জন্য সন্ত্রাসবাদ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধবিষয়ক বিমসটেকের যৌথ কার্যকরী গ্রুপ এবং এর পাঁচটি উপদলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিমসটেক সচিবালয়কে জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি), আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) এবং ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে অংশীদারত্বের সম্ভাবনা যাচাই করতে উৎসাহিত করা হয়েছে।
ঘোষণায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা সার্বভৌম সমতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক সুবিধার নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে মন্ত্রীরা বলেন, সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। অভিন্ন নিরাপত্তা অগ্রাধিকার নিয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা ও সহযোগিতা জোরদার করতে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনেও তারা সম্মত হন।
২০১৮ সালে কাঠমাণ্ডুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে নেওয়া সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই বৈঠক আয়োজনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
Related News :

সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারে প্রভাবিত না হওয়ার আহ্বান : আইএসপিআর

বিমান বাহিনীর ৫৫ বছর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

বর্ণাঢ্য আয়োজনে বাংলাদেশে উদযাপিত হচ্ছে 'বিশ্ব পর্যটন দিবস'

১৮তম জুডিসিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল প্রকাশ

জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেল ‘মিশন গ্রিন বাংলাদেশ’-এর দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া ‘টাইগার লাইটনিং-২৬’ শুরু

নৌবাহিনী প্রধান হলেন রিয়ার এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম

বিডা, বেজা ও পিপিপিএ একীভূত হয়ে গঠিত হচ্ছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’

বাংলাদেশে ইউএনডিপি'র নতুন আবাসিক প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিলেন স্টিভেন রড্রিগেস


