‘ম্যাগনেট’ -আরিফ রেজা

গল্প

‘ম্যাগনেট’ –আরিফ রেজা

পর্ব –০১

নারায়ণ চন্দ্রের বাড়ির ভেতরে যে ঘরোয়া মন্দিরটি রয়েছে সেখানে ছোটো একটা কালি মুর্তি আছে। ঐ মুর্তিটা নাকি খুব দামী পাথরের। ওর ভেতর নাকি ম্যাগনেট আছে। কোটি কোটি টাকা নাকি দাম। বাপরে বাপ, নারায়ণ ঠাকুরতো তাহলে কোটিপতি, কি বলিস? রমেশ প্রশ্ন করলো।

‘আরে ধুর, যত্তসব বাজে কথা। ম্যাগনেট ফ্যাগনেট কিছু না, একটা হুজুগ উঠছে। মানুষের টাকেও নাকি ম্যাগনেট আছে, শুনছিস কথা… মহাদেব বললো।’

‘আরে না, একেবারে মিথ্যে না। পুরনো পয়সার মধ্যে ম্যাগনেট পাওয়া গেছে অচিন্তপুর ইউনিয়নে। সেই পয়সায় আতপ চাল টানে। আরও কি কি জানি হয়। গাড়িতে উঠলে স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়, এইসব নাকি। কয়েক কোটি টাকা নাকি তার দাম। ঢাকা শহরে নাকি এই ম্যাগনেট কেনার পার্টি আছে, তাই ওরা শহরে গেছে…’

‘তাহলে নারায়ণ ঠাকুর মুর্তিটা বেচে দেয়না কেনো? মুর্তি যে ম্যাগনেটের হতে হবে এমনতো কোনো কথা নেই। ওটা বেচে দিয়ে আরেকটা কিনে নিক…।’

‘কিযে বলিস, মা কালির মুর্তি কেউ কি বেচে… রমেশ দুহাত কপালে ঠেকালো, যেন মা রাগ না করেন।’

‘মহাদেব সেটাকে পাত্তাই দিলো না। বললো, আমাদের বাড়ির কালিটা জলচৌকির পর দিয়ে পড়ে জিভ ভেঙে গেছে। কপাল চোটে গেছে। একটা হাত পর্যন্ত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো, কিন্তু মা কালির চোখ দিয়ে একফোটা জল গড়াতে দেখলাম না। বড়ো শক্ত প্রাণ…। আমার জ্যাঠা ঐ আহত কালির মুর্তিটাকে বাড়ির পেছনে নর্দমায় বিসর্জন দিলেন। পরে অবশ্য নোতুন আরেকটা এনে পূর্বের স্থানে রাখা হয়েছে। এতে ঐ আহত কালি মাইন্ড করেছে বলে মনে হলো না। তার কি কিছু বলার ক্ষমতা আছে? যে সামান্য জলচৌকির পর দিয়ে পড়ে চৌচির হয়ে যায়, তার কি এমন ক্ষমতা? এসব ধর্ম টর্ম আমার ভালো লাগে না বুঝলি, যত্তসব কেচ্ছা কাহিনী…।’

‘রমেশ কপালে দুহাত ঠেকিয়ে আতঙ্ক প্রকাশ করলো। বিড়বিড় করে বললো, দুর্গা দুর্গা…’

‘মহাদেব বললো, হ্যারে নারায়ণ ঠাকুরের মুর্তিটা চুরি করা যায় না? সত্যি সত্যিই যদি ম্যাগনেট থাকে তো?’

‘কিযে বলিস, মন্দির থেকে মুর্তি চুরি করতে যাবে কার এতবড় সাহস আছে…?’

‘আমার আছে। মহাদেব বললো।’

‘কেমন করে করবি, নারায়ণ ঠাকুরের ঘরের সাথেই মন্দির। কেউ মুর্তিটা চুরি করতে পারবে না।’

‘আমি পারবো। মহাদেব বললো। ঐ মুর্তি আমি চুরি করবো।’

‘রমেশ অনুনয় করে বললো, পাগলামি করিসনে দেবু, মা নাখোশ হলে গলা দিয়ে রক্ত উঠে মরবি কয়ে দিলাম…’

‘আমরা কি মা কালির কোনো ক্ষতি করতেছি নাকি? পুজোর জন্য মুর্তি থাকলেই হলো। ম্যাগনেটতো আর পুজোর জন্য লাগবে না। তুই দেখিস মা এতে কিছু মনে করবে না…মহাদেব কৈফিয়ত দিলো।’

‘কেমন করে দেখবো?’

‘গলা দিয়ে রক্ত না উঠলেইতো বোঝা যাবে যে মা কিছু মনে করে নাই… সহজ বুদ্ধি। আর তুই ইচ্ছে করলে মায়ের কাছে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারিস। মা উত্তর দেবেনা তোর কথার? তুই তার এতো ভক্ত…।’

‘কি জানি বাপু, তোর কথার কিচ্ছু বুঝিনা। কোনো বিপদ ডেকে আনিস নারে। এতো সাহস ভালো না।’

‘মহাদেব বললো, ঐ মুর্তি আমি চুরি করবোই। তুই আমাকে সাহায্য করবি।’

‘আমি তোর সাথে নাই ভাই। রমেশ আবারও কপালে হাত ঠেকিয়ে ডাকলো, মা মাগো…’

‘আমরা ঐ ম্যাগনেট বিক্রি করে নারায়ণের মন্দির সোনা দিয়ে গড়িয়ে দেবো। হীরের কালি মুর্তি বানিয়ে দেবো। গাঁয়ে আরও দুইটা বড়ো মন্দির করে দেবো। আর…আরও অনেক কিছু করে দেবো…’

‘রমেশের আতঙ্কিত চেহারার পর দিয়ে কেমন যেনো একটা স্বপ্নময় অনুভূতি খেলে গেলো। মহাদেব লক্ষ্য করলো সেটা। মনে মনে ভাবলো, এইতো লাইনে আসছে। এটাকে লাইনে না আনলে এই কাজ করা যাবে না। যে জানে তাকেই সাথে রাখতে হয়। যে জানে না তাকে জানাতে নেই…।’

নারায়ণ ঠাকুরের পারিবারিক মন্দির। বাইরের মানুষের যাতায়াত সেখানে একেবারেই নেই বলা যায়। কাজেই ঘরের সঙ্গে লাগোয়া এই মন্দিরে লোকচক্ষুর আড়ালে প্রবেশ করাটা খুব সহজ কোনো কাজ নয়। তাহলে উপায়? মুর্তি চুরি করা হবে কেমন করে? মহাদেব ব্যাপক গবেষণা করলো সারাদিন। দুই দুইবার নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ির গা ঘেঁষে যে মাটির চিকন রাস্তাটা বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে সোজা বেড়িবাঁধে গিয়ে মিশেছে, ঐ রাস্তা দিয়ে হেটে গিয়েছে। বাঁশঝাড়ের আড়ালে দাড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করেছে অনেক কিছু। শেষমেশ আবিষ্কার করলো যে, মূল বাড়ির পেছনের অংশে টালি দেয়া ঘরটিই মন্দির। এবং এর পেছনের দেয়ালে মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে একটা ছোট্ট জানালার মতো আছে। এই জানালাই যে প্রথম এবং একমাত্র পথ সেটা মহাদেব বুঝে নিয়েছে। এই জানালায় পৌঁছাতে পারলেই ভেতরের অবস্থা বোঝা যাবে… এবং অপারেশনের দ্বিতীয় ধাপে পৌঁছানো যাবে। কথা হলো জানালাটা মাটি থেকে বেশ উঁচুতে। বাইরের পরিবেশটা বেশ জংলা। সাপখোপের ভয় আছে। অদূরে একটা গাছ দেখা যাচ্ছে, কি গাছ ওটা? কদম গাছ মনে হচ্ছে। যাইহোক একটা ছোটোখাটো মই হলেই হয়ে যাবে। এরকম ছোটো মই মহাদেবের বাড়িতেই আছে। এসব কাজে দেরি করতে নেই। আজ রাতেই অপারেশন…।

‘মহাদেব মনে মনে ভাবলো, রমেশ শালাটা আবার বিগড়ে না যায়। যেভাবেই হোক শালাকে সাথে রাখতে হবে।’

ঝিঝি পোকারা ব্যাপক চিৎকার শুরু করেছে। কোটি কোটি জোনাকি পোকা জঙ্গল বাঁশঝাড়ের মধ্যে জ্বলছে নিভছে। যেনো মিটিমিটি করে অজস্র হীরক বিন্দু ভেসে বেড়াচ্ছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে। খুব কাছেই, সম্ভবত বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে শেয়ালের হাঁক শোনা গেলো, এইমাত্র। কিছুক্ষণ বাদেই অসংখ্য শেয়ালের সমস্বরে চিৎকার শুরু হলো। কি এক ভয়ঙ্কর মাতমের মতো সে সুর… গা ছমছম করা পরিবেশ…

‘রমেশ বললো, চল ফিরে যাই, আমার খুব ভয় করছেরে…’

‘মহাদেব ফিসফিস করে বললো, আরে ধুর, কিসের ভয়? কিসের ভয় বললেও আসলে তার নিজেরও কিছুটা ভয় ভয় লাগছে, কিন্তু এটা রমেশকে বুঝতে দেয়া যাবে না। মহাদেব বাঁশের মইটা মাটিতে শুইয়ে রাখলো। হাতের চিকন নিল আলোর টর্চ লাইটটা একবার ফেললো মইটার উপর, আবার সাথে সাথেই নিভিয়ে দিলো।’

‘রমেশ আবারও বললো, এসব ম্যাগনেট ফ্যাগনেটের লোভ করার দরকার নেই, চল ফিরে যাই। এই ম্যাগনেট আমরা বেচবো কার কাছে? কে আমাদের টাকা দেবে?’

‘মহাদেব একটু যেনো চিন্তিত হলো। আসলেই তো এ-ই ম্যাগনেট বেচবো কার কাছে… পরক্ষণেই এই চিন্তা দূর করে দিয়ে ভাবলো, সেটা পরে দেখা যাবে… ম্যাগনেট পাওয়ার পরেই না বিক্রির কথা…।’

চারিদিকে সুনসান নীরবতা। নিঝুম প্রকৃতির শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই। মহাদেব মইটাকে মাটি থেকে টেনে তুললো। রমেশকে বললো, ধর। রমেশ কাঁপা কাঁপা হাতে মইটা ধরলো। তার শরীরের মধ্যে সে একধরনের দূর্বলতা অনুভব করলো। এতটুকু একটা বাঁশের মই তার কাছে বিশাল ভারি মনে হলো।

‘জানালার নিচে দেয়ালের গায়ে মইটাকে খাড়া করে লাগিয়ে মহাদেব আবারও রমেশকে ফিসফিস করে বললো, শক্ত করে ধরিস কিন্তু, সরে না যায়… বলে সে মই বেয়ে ওঠা শুরু করলো। কয়েক ধাপ উঠেই জানালার মুখে এসে দাড়ালো। রমেশ একভাবে মনে মনে দুর্গা, কালি, লক্ষীর নাম যপে যাচ্ছে…।’

জানালাটা ছোটোই। চারিদিকে কাঠের ফ্রেম। অনেক পুরনো আমলের। মাঝখানে চিকন চিকন চারটে কাঠের গোল কাঠির মতো রড। ভেঙে ফেলা কঠিন কিছু না। কিন্তু কথা হচ্ছে এই জানালা দিয়ে কি ভেতরে ঢোকা যাবে? যাবে বোধহয়, কিন্তু একটু কষ্ট করতে হবে। কষ্টতো করতেই হবে, তা-না হলে কেষ্ট মিলবে কেমন করে? মহাদেব জানালা দিয়ে টর্চের আলো যেইনা ফেলতে যাবে, ওমনি তার কানে ঘড়ঘড় নাক ডাকার শব্দ ভেসে এলো। কি বিকট শব্দরে বাবা। মহাদেব থমকে গেলো। রমেশকে কিছু বললো না। ভেতরে টর্চের আলো ফেলবে কি-না সেইটা ভাবলো একমুহূর্ত। যেহেতু নাক ডাকার শব্দটা অতি তীব্র, সেহেতু একঝলক আলো ফেললে কিছু হবে না। মহাদেব টর্চের নিল আলো ভেতরে ফেললো। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ভুড়িওয়ালা ঠাকুর চিত হয়ে ঘুমাচ্ছে। এইসব ঠাকুরদের ঘুম হয় মারাত্মক। বোমা মারলেও এদের ঘুম ভাঙতে চায় না, মহাদেব জানে সেটা। ভগবানের কাছের মানুষ হিসেবে তারা এক ধরনের মানুষিক প্রফুল্লতায় থাকে বলেই নিশ্চিতে বেঘোরে ঘুমায় নাক ডেকে। কাজেই অতো সহজে এই ঠাকুরের ঘুম ভাঙবে না। এই বিশ্বাসে মহাদেব আবারও টর্চের আলো ফেললো ঘরের কোনায় কানায়। এইবার দেখা গেলো সেই বিখ্যাত মুর্তিটাকে। জানালার ঠিক নিচ বরাবর একটু ডানে একটা বড়ো জলচৌকির পর রয়েছে মুর্তিটি…। মহাদেব ভাবছে কি করে এই মুর্তি বের করা যায়। জানালা ভেঙে মন্দিরের ভেতর ঢোকার প্রশ্নই আসে না। শালার ঠাকুর যে মন্দিরেই ঘুমায় এইটাতো জানা ছিলো না। কি করা যাবে এখন? মহাদেব ভাবতে লাগলো। হ্যাঁ, একটা উপায় আছে, দড়ি। দড়ি দিয়ে ফাঁসকল বানিয়ে মুর্তিটার গলায় পরিয়ে উপরে টেনে তুলতে হবে। এছাড়া আর কোনো পথ নেই। মুর্তিটার সাইজ বেশি বড়ো না। জানালার একটা কাঠের সিক ভাঙলেই বেরিয়ে আসবে। মহাদেব আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে নিচে নেমে এলো। মন্দিরে ঠাকুরের অবস্থানের কথা সে রমেশকে বললো না। এতে তার ঘাবড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। তাই সে রমেশকে ফিসফিস করে বললো, শোন, ভেতরে ঢোকার দরকার হবে না। একটা দড়ি হলে মুর্তিটা আস্তে আস্তে জানালা দিয়ে নিজেই বেরিয়ে আসবে।

‘রমেশ বললো, মানে?’

‘মানে হচ্ছে, একটা দড়ি দিয়ে ফাঁসকল বানিয়ে মুর্তিটার গলায় পরিয়ে টেনে নিয়ে আসবো। একদম হাতের কাছেই আছে…’

‘এই রাতে এখন দড়ি পাবো কোথায়?’

‘সেটাইতো ভাবছি। মহাদেব চিন্তিত ভাবে বললো। এক কাজ কর, তুই এখানে থাক, আমি দড়ি খুঁজে আনি।’

‘রমেশ আতঙ্কিত হয়ে বললো, ওরে বাবা না না, আমি একা একা থাকতে পারবো না।’

‘মহাদেব বললো, আচ্ছা তাহলে তুইও চল আমার সাথে। মই এখানেই থাক…।’

মহাদেবের বাড়ি পাঁচ সাত মিনিটের পথ। গ্রামাঞ্চলের বাড়ি ঘরে দড়ি খুঁজে পাওয়াটা খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। কিন্তু এই অন্ধকার রাতে ঠিক কোথায় যে পাওয়া যাবে… কেউ দেখে ফেললেও আর এক বিপত্তি… এ্যাতো রাতে দড়ি কি কাজে লাগবে, নানান প্রশ্ন উঠবে…। মহাদেব চোরের মতো চুপিচুপি নিজ বাড়িতে দড়ি খুঁজতে লাগলো। রমেশ জড়োসড়ো হয়ে উঠোনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে আছে। শেষমেশ দড়ি পাওয়া গেলো গোয়ালঘরে। গরু বাধা দড়ি। বেশ মজবুত। এ্যাতো মজবুত দড়ি না হলেও চলতো। যাক ঠাকুরের মুর্তি বলে কথা, যেনো তেনো দড়ি কি আর তার গলায় পরানো যায়…।

‘রমেশের কাছে এসে মহাদেব ফিসফিস করে বললো, চল দড়ি পাওয়া গেছে।’

‘রমেশ বললো,ভয় ভয় লাগছেরে…’

‘মহাদেব বললো, বাসর ঘরে ঢুকতেও একটু একটু ভয় ভয় লাগে… ওটা কোনো বিষয় না। ভয়কে জয় করাইতো পুরুষ মানুষের কাজ। একবার ভাব এই মুর্তিতে যদি সত্যিই ম্যাগনেট থাকে তাহলে আমাদের কপালতো খুলবেই, সাথে ঠাকুরের মন্দিরও আমরা সোনা দিয়ে বান্দিয়ে দেবো…কতো পূণ্য হবে তাতে…’

‘রমেশ হু হা কিছুই বললো না। তার মাথা কোনো কাজই করছে না। সে যেনো একটা চক্করে ফেঁসে গিয়েছে। এরকম একটা চেহারা নিয়ে সে মহাদেবের সাথে দূর্বল পায়ে চলতে লাগলো।’

গভীর রাত। এই দুজন ছাড়া সম্ভবত এই তল্লাটে আর কেউ জেগে নেই। উপর্যুপরি শেয়ালের হাঁক, ঝিঝির ডাক। ভৌতিক নিরবতা। এই ঝোপঝাড় ভেঙে, বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে তারা আবার ঠাকুরের মন্দিরের পেছনে এসে উপস্থিত হলো। মন্দিরের জানালার নিচে যেখানে মইটা দাঁড়া করে রেখেছিলো, সেখানে মহাদেব তার নিল আলোর টর্চটা জ্বালতেই দুজনেই একসাথে চমকে উঠলো, মই কৈ? এখানেই তো ছিলো… মই গ্যালো কৈ? তাদের দুজনের বুক ছ্যাত করে উঠে কামারের হাপরের মতো ধুপ ধুপ করে উঠানামা করতে লাগলো। তাজ্জব ব্যাপার! এ্যাতো রাইতে মই গ্যালো কৈ…!

‘রমেশ কাঁপতে কাঁপতে বললো, ভাই মই লাগবে না, চল পালাই…মায়ের মুর্তি…’

‘মহাদেব মুখে কিছু না বললেও তার চেহারাটাও অনেকটা একই রকম কথা বলছে। যদিও মহাদেবের সাহস একটু বেশি। মনটা তুলনামূলক যুক্তিবাদী। সে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। ভূতপ্রেত এসবে ঠিক বিশ্বাস করে না।কিন্তু তারপরেও… মই গ্যালো কৈ…? সে সাহস করে টর্চটা জ্বালিয়ে জানালার দিকে এগিয়ে গেলো। রমেশ কিছুতেই মহাদেবের শরীর থেকে নিজের শরীরকে আলাদা হতে দিচ্ছে না। মহাদেবের সাথে গা জড়াজড়ি করে সেও এগিয়ে চললো। মন্দিরের দেয়ালের একদম কাছে এসে দেখা গেলো, মইটা কাৎ হয়ে ঝোপের মধ্যে পড়ে আছে। দুজনের প্রাণেই যেনো পানি ফিরে এলো এইবার।’

‘মহাদেব মুচকি হেসে বললো, কি ভয় পেয়েছিলি? ভূত বলে কিছু নেই, মানুষই হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো ভূত…।’

মহাদেব আবার মইটাকে টেনে জায়গা মতো দাঁড় করালো। দড়ির এক মাথায় গিরে দিয়ে আরেক মাথা সেই গিরের মধ্যে দিয়ে ঘুরিয়ে এক ধরনের ফাঁস তৈরি করলো। কোমরে হাত দিয়ে দেখলো ভাজ করা আম কাটার ছুরিটা ঠিকঠাক আছে কিনা। তারপর টর্চটা মুখে নিয়ে আস্তে আস্তে মই বেয়ে উপরে উঠতে লাগলো। নিচে রমেশ কাঁপা কাঁপা হাতে মইটা ধরে দাড়িয়ে রইলো। এইবার মূল অপারেশন শুরু…।

জানালার কাছে পৌঁছে মহাদেব কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইলো। কান পেতে বোঝার চেষ্টা করলো ঠাকুরের নাক আগের মতোই ডেকে চলেছে কিনা। প্রথমটায় কিছু বোঝা না গেলেও দুএক সেকেন্ড পরেই সেই ব্রাহ্মনী নাকের বনেদি গর্জন পাওয়া গেলো। মহাদেব আস্বস্ত হয়ে মুখ থেকে টর্চটা হাতে নিয়ে নিল আলোটা একঝলক মন্দিরের ভেতর ফেলে তার নিশানা ঠিক করে নিলো। তারপর আলো নিভিয়ে লুঙ্গির গাঁট থেকে ভাঁজ করা ধারালো ছুরিটা বের করে জানালার কাঠের গোল সিকটার এক মাথায় আস্তে আস্তে শব্দহীন ভাবে পোঁচাতে লাগলো। অনেকটা কাটা হলে আরেক মাথায় শুরু করলো। ছুরিটা বেশ ধারালো। দু’মাথাই বেশ খানিকটা কাটা হলে হাত দিয়ে একটু চাপ দিতেই টুক করে সামান্য শব্দ করে কাঠের রডটা মহাদেবের হাতে চলে এলো। এতেই কাজ হয়ে যাবে। মায়ের মুর্তি এখান দিয়েই নাচতে নাচতে বেরিয়ে আসবে। এবার মহাদেব নিজেই মাথার কিছুটা অংশ জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে আর একবার টর্চের আলো ফেললো ভেতরে। মুর্তিটার সাথে একবার ঠাকুরের খান্দানী ভুঁড়িটার উঠানামাও একঝলক দেখে নিয়ে হাতের দড়িটা আস্তে করে নামিয়ে দিলো জানালার নিচ বরাবর জলচৌকির উপর দাড়িয়ে থাকা মুর্তিটার গলায়। দড়িটার গোল ফাঁসের অংশটা মুর্তিটার গলায় মালার মতো পরিয়ে আস্তে আস্তে টানতে শুরু করলো। থুতনি আর গলার মাঝামাঝি অংশে দড়িটা বেধে যখন উপরের দিকে টান পড়লো, ফাঁসটা ছোটো হয়ে একদম গলাটাকে আঁকড়ে ধরলো। আর বাঁচার পথ নেই। এই ফাঁস খুলে পালাবার ক্ষমতা এই জড়ো মুর্তির নেই। সে অসহায় ভাবে গলায় ফাঁস নিয়ে জানালার দিকে উঠে আসতে শুরু করলো। জানালার কাছে আসতেই মহাদেব খপ্ করে মুর্তিটার মাথা ধরে বাইরে বের করে আনলো। তারপর ফাঁস সমেত মুর্তিটাকে ঝুলিয়ে নিচে রমেশের দিকে নামিয়ে দিলো। রমেশ কাঁপা কাঁপা হাতে মুর্তিটা ধরে বার কয়েক মুর্তিটার পায়ে নিজের মাথা ঠুকলো। তারপর বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে থাকলো।

মহাদেব জানালার ভাঙা কাঠের রডটা একবার দেখলো। জানালার সাথে দু’মাথায় রডের কিছুটা অংশ বেরিয়ে আছে। কিছুটা কোনা বেরিয়ে থাকার মতো। মহাদেব ভাবছে রডটাকে আবার জায়গা মতো সেট করা যায় কি-না। তাহলে চুরির আর প্রমাণ পাওয়া যাবে না। সে ভাঙা রডটাকে বেরিয়ে থাকা কোনার উপর আলতো করে বসিয়ে দিলো। রডটা বসে গেলো ঠিকই, কিন্তু একটু বাতাস হলে পড়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। যাইহোক আপাতদৃষ্টিতে জানালাটাকে অক্ষতই মনে হচ্ছে। মহাদেব নিচে নেমে এলো। ভালো করে টর্চ জ্বেলে অপারেশন স্পট দেখে নিলো। কোনো প্রকার আলামত ফেলে যাচ্ছে কিনা। তারপর কোমর থেকে নোতুন গামছা খুলে মুর্তিটাকে পেঁচিয়ে মই দড়িসহ সবকিছু বুঝে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলো। অপারেশন সাকসেসফুল।

রমেশ আর বাড়ি ফিরে গেলোনা। রাতে সে মহাদেবের সাথে তার ঘরেই থেকে গেলো। মহাদেব খুব গোপনে মুর্তিটাকে তার চৌকির তলায় লুকিয়ে রাখলো। কাকপক্ষীও টের পেলো না তাদের এই অভিযানের কথা। এখন পরীক্ষা নিরিক্ষার পালা, সত্যিই এই মুর্তিতে ম্যাগনেট আছে কি-না। তারা আগেই শুনেছে, যদি ম্যাগনেট থাকে তাহলে আতপ চাল সামনে রাখলে এই ম্যাগনেট চালকে টেনে কাছে নিয়ে আসবে। চালের ভেতরের রস সব শুষে নেবে। চাল হাতে নিয়ে ডলা দিলে গুঁড়ো হয়ে যাবে…। এই ম্যাগনেটের সামনে চালানো অবস্হায় রেডিও আনলে সেটা বন্ধ হয়ে যাবে..। ঘড়ি বন্ধ হয়ে যাবে…ইত্যাদি। কিন্তু আজ রাতে এইসব পরীক্ষার কিছুই করা সম্ভব নয়। যা করার ধীরে সুস্থে করতে হবে। তাই নোতুন লাল গামছায় মোড়ানো মুর্তিটা চৌকির তলায়, আর চৌকির উপরে দুবন্ধু এপাশ ওপাশ করতে লাগলো…

পর্ব–০২

নারায়ণ ঠাকুরের গভীর ঘুম ভোর রাতে পাতলা হতে হতে প্রথম পাখিটা ডেকে উঠার আগেই ভেঙে যায়। তার মানে সূর্যি মামা জাগার আগে উঠবো আমি জেগে… এরকমটা আরকি। নারায়ণ চন্দ্র আড়মোড়া ভেঙে সেই আবছা আলো-আঁধারির ভোরে প্রথমেই মার মুর্তিতে বারকয়েক প্রণাম করেই মন্দিরের দোর খুলে বদনা হাতে কলতলায় ছোটে। এটা তার নিত্য দিনের রুটিন। আজ ব্যতিক্রম হবার কোনো কারণ নেই। ঠাকুর মশাই কাক কা কা করার আগেই তার বিশাল ভুঁড়ি নিয়ে মেঝেতে বিছানো শীতলপাটির পরে বার দুয়েক বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে আড়মোড়া ভাঙলেন। হাত দিয়ে পিঠের তলা থেকে টেনে তার ব্রাহ্মনী পৈতে ঠিক করে হাই ছাড়তে ছাড়তে উঠে বসলেন। তারপর ঘুম জড়ানো চোখ রগড়াতে রগড়াতে মাঝে কালির জলচৌকির উপর দুবার মাথা ঠুকলেন। হাতজোড় করে বিড়বিড় করে ডাকলেন, মা মাগো…। সম্ভবত মায়ের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে সে পূর্ণ চোখ মেলেই চক্ষুচড়ক গাছ হয়ে সটাং দাঁড়িয়ে পড়লো। বেশ কয়েকবার হাত দিয়ে চোখ ভালো করে কচলালো। তারপরেও তার নিজ চোখের উপর সন্দেহ দূর হলোনা। চোখটা কি নষ্ট হয়ে গেলো কি-না এরকম একটা ধারণা নিয়ে সে দরজা খুলে মন্দিরের ভেতর আলো ঢোকার ব্যবস্থা করেই চিৎকার, না ঠিক চিৎকার নয়, গোঙানির মতো একটা বিকট আওয়াজ করেই সেই জলচৌকির সামনেই ওরে মারে বলে গড়িয়ে পড়লো। তার সেই গোঙানি আর মাংসবহুল থলথলে ভূঁড়ির পতনের শব্দে বাড়িসুদ্ধ তো বটেই আশপাশের কয়েক বাড়ির লোকদের ভোরের এই আরামের ঘুমকে তছনছ করে দিয়ে ছুটিয়ে ঘরের বার করে ছাড়লো। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই জনা বিশেক মানুষ মন্দিরের দরজায় হাজির হলো। সবাই একত্রে একই প্রশ্ন করতে লাগলো, কি হয়েছে ঠাকুর মশাই? কি হয়েছে…?

‘ঠাকুর মশাই পৌনে অচেতন, মানে সম্পুর্ন অচেতন হবার আগমুহূর্তে কোনো মতে উপস্থিত লোকদের দিকে তাকিয়ে – মা, মা নেই… বলেই পুরোপুরি অচেতন হলেন।’

খবরটা তুফানমেলের চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে নারায়ণ চন্দ্রের বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে গেলো। সকলেই একটি বিষয়ে একমত হলো যে, কলি কাল, কলি কাল…। দরজা-জানালা, চাল-দেয়াল…সব ঠিক আছে, মা নেই…। ঘোর অমানিশা ঘনিয়ে আসছে, ঘোর অমানিশা…। মহা দুর্যোগ ধেয়ে আসছে, মহা দুর্যোগ…। এই পাপের মর্ত্যকে ছেড়ে মা চলে গিয়েছে… বিপদ আসছে, মহা বিপদ…

একটা দিন পার হয়ে গেলো। নারায়ণ ঠাকুরকে জল পর্যন্ত স্পর্শ করানো গেলো না। প্রথমদিন তবুও কিছুক্ষণ পরপর বলছিলো, মা-মাগো মা… কিন্তু এখন তা-ও বলা বন্ধ করে দিয়েছে। খালি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে…।

এই একটা দিনেই তার ভূ্ঁড়ি ইঞ্চি দুয়েক কমে গিয়েছে। কপালের ভাঁজ বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ। চোখ কোটরাগত হয়েছে। সাদা সাদা গোঁফ-দাড়ির মাথা সারা মুখ চোয়াল দখল করে নিয়েছে…। নারায়ণ চন্দ্র যাকে বলে সত্যিকার অর্থেই ভেঙে পড়েছেন…।

তার একমাত্র মেয়ের জামাই শ্বশুর মশাইয়ের এহেন অবস্থা দেখে মুর্তি শালা থেকে আরও আধফুট লম্বা একটা কালি মুর্তি কিনে এনে পূর্বের জলচৌকিতে স্থাপন করলেও নারায়ণ চন্দ্রের কোনো ভাবান্তর দেখা গেলো না। একবারও মা-মাগো বলে ডাক দিলো না। এ যেনো আপন মাতৃবিয়োগের শোক কী আর বিমাতায় ভোলা যায়…।

মহাদেব ম্যাগনেট পরীক্ষার যাবতীয় উপকরণ জোগাড় করে ফেলেছে। আতপ চাল ঘরেই ছিলো। বাজারের ঘড়ি মেরামতের দোকান থেকে একদিনের জন্য একটা কাঁটাওয়ালা হাতঘড়ি ধার নিয়ে এসেছে। দুই ব্যাটারী চালিত একটা রেডিও আছে রমেশের বাড়িতে। সেটাতে নোতুন ব্যাটারী ভরা হয়েছে। এখন পরীক্ষার পালা। মহাদেব চৌকির তলা থেকে খুবই সাবধানে নিঃশব্দে নোতুন লাল গামছায় মোড়ানো মুর্তিটাকে বের করে চৌকির উপরে রাখলো। রমেশ ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাত জোড় করে বারবার কপালে ঠেকালো। মহাদেব মুর্তির শরীর থেকে জড়িয়ে রাখা গামছা খানা খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু নোতুন গামছা থেকে আলগা সুতো মুর্তির বিভিন্ন অংশে পেচিয়ে যাওয়াতে প্রথমটায় গামছা খানা আলাদা করতে একটু সমস্যা হচ্ছিলো, তাই পেচিয়ে যাওয়া সুতো হাত দিয়ে ছিড়ে ছিড়ে গামছা খানা আলাদা করা হলো। লাল লাল সুতো মুর্তির সারা শরীরে বিভিন্ন অংশে পেচিয়ে রয়েছে এখনো। যাইহোক পুজোর মুর্তির সামনে যেমন ভোগ রাখা হয়, তেমন করে একমুঠ আতপ চাল রাখা হলো মা কালির সামনে। জায়গার চাল জায়গায় দাড়িয়ে থাকলো, মায়ের দিকে এগিয়ে গেলো না। এইবার টিকটিক ঘড়ি খানা আনা হলো মায়ের সামনে। মায়ের সামনে ঘড়ির কাঁটাও টিকটিক করে বেয়াদবের মতো ঘুরেই চললো, থামার কোনো লক্ষণই দেখা গেলো না। মহাদেব এবং রমেশ দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। মহাদেবের কপালের ভাঁজে বিরক্তির বলিরেখা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে… সব পরীক্ষাই ফেল, আর মাত্র একটি পরীক্ষা বাকী। মহাদেব চোখের ইশারা করাতে রমেশ রেডিওটা অন করে গজ গজ শব্দ হচ্ছিলো বলে নব ঘুরিয়ে একটু টিউনিং করতেই আব্বাসউদ্দীন দরাজ কন্ঠে গেয়ে উঠলো, আল্লাহ মেঘ দে, পানি দে, ছায়া দেরে তুই…। পুরনো নড়বড়ে রেডিও খানা একটু সাউন্ড কমিয়ে মুর্তির পায়ের কাছে রাখতেই থেমে গেলো। মহাদেবের মনটা হঠাৎ কেমন চনমন করে উঠলো… এইতো এইতো… কিন্তু রমেশের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী রেডিওটার গায়ে আস্তে করে দুটো থাপ্পড় মারতেই আব্বাসউদ্দীন আবার গাওয়া শুরু করলো, মেঘ দে পানি দে…। মহাদেবের মেজাজ এবার সত্যিই বিগড়ে গেলো। শালা ম্যাগনেট না ঘোড়ার আন্ডা আছে এর মধ্যে… শুধু শুধু…

‘রমেশ বললো, আমিতো তোকে মানা করেছিলাম…।’

‘ম্যাগনেটের খবরটাতো তুই দিয়েছিলি, মহাদেব বললো।’

‘আমিতো শুধু শুনেছিলাম তাই বললাম, রমেশ বললো।’

‘মহাদেব চিন্তিত হয়ে বললো, এখন এই মুর্তি নিয়ে আমরা কী করবো’

‘রমেশ বললো, আগেই বলেছিলাম লোভ করার দরকার নেই…।’

দুজনের কথাবার্তা চলছে একদম নিচু গলায়। ফিসফিস করে। গভীর রাতের ফিসফিস কথাও অনেকদূর যায়। ঘটনার পর তিনটা রাত পার হয়ে গিয়েছে। আজ চতুর্থ রাত।

‘মহাদেব বললো, চল মুর্তিখানা রাত থাকতে থাকতে পানিতে ফেলে দি…।’

‘রমেশ আতঙ্কিত হয়ে বললো, অমন অলক্ষুণে কথা বলিসনে…’

‘তাহলে এখন কী করবো, এই মুর্তি নিয়ে পুজো করবো? চারিদিকে হৈচৈ পড়ে গেছে… নারায়ণ ঠাকুর অন্নজল ত্যাগ করেছে…।’

‘রমেশ বললো, চল জায়গার মুর্তি জায়গায় রেখে আসি…।’

‘মহাদেব বললো, মাথা খারাপ! চুরি করার সময় ধরা পড়িনি… ফিরিয়ে দেয়ার সময় ধরা পড়ে চোর সাজতে রাজি নই, তারচে… মহাদেব চিন্তিত হয়ে বসে রইলো।’

‘রমেশ বললো, কী তারচে…?’

‘মহাদেব হঠাৎ করে যেনো কোনো আইডিয়া পেয়ে গেলো। বললো, চল-।’

‘রমেশ বললো, কোথায়?’

‘চল আমার সাথে। মহাদেব দাড়িয়ে পড়লো।’

‘রমেশও চৌকি থেকে নেমে ফিসফিস করে বললো, কোথায় যাবি বলবিতো…।’

‘মহাদেব কোনো উত্তর দিলো না। গামছা দিয়ে মুর্তি খানা আবার পেচিয়ে নিলো। ঘড়ির দিকে টর্চের আলো ফেলে দেখলো রাত তিনটে বাজে। শেয়ালের দল, ঝিঝি পোকারাও ঘুমিয়ে পড়েছে বোধহয়। এ্যাতো রাতে কারোরই জেগে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। মহাদেব আবার বললো, আয় আমার সাথে, বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো…। রমেশও বিনাবাক্যব্যয়ে তার পিছু নিলো।’

নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ির অদূরে এসে তারা দাড়ালো। অন্ধকার রাত। খুব কাছ থেকেও কিছু দেখা যায়না। মহাদেব বোঝার চেষ্টা করছে, ঘরে কোনো হারিকেন বা কুপী জ্বলছে কি-না। না, একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মহাদেব পা টিপে টিপে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেলো। বুকে গামছায় মোড়ানো কালি মুর্তি। রমেশও যতোটা না সহযোগিতায় তারচেয়ে ভয়ের কারনেই মহাদেবের সাথে সাথে চলতে লাগলো। মহাদেব একেবারে নারায়ণ ঠাকুরের মন্দিরের দরজার সামনে এসে দাড়ালো। আস্তে করে মুর্তি খানা দরজার সামনের বাধানো পাকা সিড়িটার উপর রেখে গামছা খানা খুলে নিলো। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। একঝলক টর্চের আলো ফেলে সাথে সাথে নিভিয়ে দিতে হয়। যা বোঝার ঐ একঝলকের মধ্যেই বুঝে নিতে হয়। মহাদেব বুঝলো সব ঠিক আছে। এবার তাদের দ্বায়িত্ব শেষ। তারা ফিরে আসছে। একটুও শব্দ না করে, একটাও কথা না বলে কাজটা সমাধা হয়েছে। কয়েক পা এগিয়ে মহাদেব হঠাৎ দাড়িয়ে পড়লো। সাথে সাথে রমেশ অতি ফিসফিস করে বললো, কি হয়েছে?’

‘মহাদেব বললো, দাড়া। তারপর নিচু হয়ে হাত দিয়ে একটু শিশিরভেজা মাটি ও ঘাস ছিড়ে সে আবার মুর্তিটার দিকে এগিয়ে গেলো। আবার একঝলক টর্চের আলো। রমেশ দেখলো মহাদেব ঐ মাটি মুর্তির পায়ে লাগিয়ে দিলো। ছেড়া ঘাসগুলো ছিটিয়ে দিলো পায়ের উপর। রমেশ কৌতুহল চেপে রাখতে না পেরে বললো, কী করছিস? মহাদেব বা হাত দিয়ে রমেশের মুখে চাপা দিলো। তারপর দু’জনে প্রথমে পা টিপে টিপে, পরে হনহন করে বাড়ি ফিরে এলো…।’

পর্ব –০৩

নারায়ণ ঠাকুর প্রথম দু’দিন পুরোপুরি বিমুঢ় হয়ে ছিলেন। ডাক্তার কবিরাজ পর্যন্ত আনতে হয়েছিল। তারপর একটু একটু করে পেটে দানাপানি পড়েছে। এবং কিঞ্চিত সামলে উঠেছেন। তবে শোক এখনো পুরোপুরি কাটেনি। সেদিনের পর থেকে সে আর মন্দিরে ঘুমায়নি। পরিবারের অন্যদের সাথে ঘরেই ঘুমিয়েছে। তবে ভোর বেলা সবার আগে ঘুম থেকে উঠা এটা তার মজ্জাগত স্বভাব। ভোরের মৃদু আলো ফুটতেই তার পিঠ আর বিছানা শত্রু হয়ে যায়। আর বদনা হয়ে যায় বন্ধু। কাজেই মন্দিরে ঘুমাক আর ঘরেই ঘুমাক ভোর বেলা সে দরজা খুলে বাইরে বেরোবেই। কিন্তু এইরকম একটা মানসিক ধকলে সে আসলেই বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার অবুঝ মন কিছুতেই মানছে না। খালি মনে হচ্ছে, মা তাকে ত্যাগ করেছে, সে পাপী… এই বিষন্ন মন নিয়ে সে আজ ঘুম ভেঙে দেখলো, অন্যদিনের তুলনায় আলো কিছুটা গাঢ় হয়ে গেছে। যদিও এখনো কেউ ঘুম থেকে উঠেনি। সে দরজা খুলে বাইরে এসে দাড়ালো। বার দুয়েক দুগ্গা দুগ্গা বলে যব করলো। অবচেতন মনেই মন্দিরের দরজায় তাকালো। সাথে সাথে তার সারা শরীর রি রি করে কেঁপে উঠলো। মাথার চুলগুলো যেনো দাড়িয়ে গেলো। চোখ দুটো যেনো বিস্ফারিত হয়ে গেলো। দু-তিন দিনের না খাওয়া দুর্বল শরীর আচমকা এই বিস্ময় সহ্য করতে পারলোনা। ওরে মারে বলেই ঢপাস করে ওখানেই পড়ে গেলো। দৃশ্যটা প্রায় একইরকম। সেদিন ছিলো ইনডোর, আর আজ হচ্ছে আউটডোর। লোকজনের ছুটে আসার ব্যাপারটাও সেদিনের মতোই দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হলো। ঠাকুরের এমন পতনের কারণে কারো দৃষ্টি আর মন্দিরের দরজায় পৌঁছালো না। সবাই ঠাকুরকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কেউ গায়ে মুখে পানির ছিটা দিতে লাগলো। কেউ চেচিয়ে চেচিয়ে ডাকতে লাগলো, ঠাকুর মশাই, ও ঠাকুর মশাই… কোনোতায় কোনো কাজ হয়না, ঠাকুর মশাই মটকা মেরে পড়েই রইলো। শেষমেশ খুঁচিয়ে গুঁতিয়ে পানির ছিটা দিয়ে যখন তাকে আবার জাগানো হলো, তখন নানান জনের নানান প্রশ্নের আগেই তার দৃষ্টির অনুসরণে সবার দৃষ্টি মন্দিরের দরজায় গিয়ে আটকে গেলো। সবাই নির্বাক, হতভম্ব…একি! হারানো মুর্তি মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়ে। ছানাবড়া চোখগুলো একবার ঠাকুরের দিকে একবার মুর্তির দিকে ঘুরতে লাগলো। ঠাকুর মশাই কয়েক সেকেন্ড ঠায় বসে থেকে, ওরে মারে… বলে চিৎকার দিয়ে আবারও চিৎ হয়ে মূর্ছা যাবার ভঙ্গিতে পেছনে পড়তে গিয়েও কি মনে করে সিদ্ধান্ত বদল করে ভুট হয়ে একেবারে সোজা মুর্তির পায়ের উপর গিয়ে পড়লো। এবং একভাবে প্রলাপ বকে চললো, মা মাগো, আমায় ক্ষমা কর মা, আমায় ক্ষমা কর… আমি তোর অযোগ্য পাপী সন্তান… আমায় ক্ষমা কর… বলেই মুর্তির পায়ে মাথা ঠুকতে শুরু করলো।

‘ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন বললো, ঠাকুর মশাই দেখুন মায়ের পায়ে কাদামাটি ঘাস লেগে আছে, সারা শরীর লাল সুতায় পেচানো…’

ঠাকুরের প্রলাপ থেমে গেলো। সত্যিইতো! হাত দিয়ে মুর্তির পায়ের মাটি স্পর্শ করে নিজ মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ওরে মা যে হেঁটে হেঁটে চলে এসেছে, পায়ে ঘাস মাটি লেগে রয়েছে, মা…মাগো…

‘ঠাকুর মশাই মায়ের সারা গায়ে লাল সুতো…’

‘ঠাকুর মশাই আর্তনাদের সুরে বললো, ওরে মা আমাদের জন্য নিশ্চয়ই কোনো আশীর্বাদ নিয়ে এসেছেন। এ সুতোতো কোনো সাধারণ সুতো মনে হচ্ছে না! এতো স্বর্গীয় সুতোরে…স্বর্গীয় সুতো…। ঠাকুর মশাই মু্র্তির শরীর থেকে এক টুকরো সুতো ছাড়িয়ে নিজ গলায় পেচিয়ে নিলো…।’

ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেলো। বিষ্ময়কর খবর! সম্ভবত আলোর গতির চেয়েও এই ধরনের খবরের গতি আরও তীব্র। কারণ, বেলা পুরোপুরি পোক্ত হবার আগেই চারিদিকে ঢেরা পেটানোর মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়লো। নারায়ণ ঠাকুরের কালি মুর্তি নিজে নিজেই ফিরে এসেছে। সাথে করে নিয়ে এসেছে স্বর্গীয় লাল সুতো। এই সুতো শরীরে ধারণ করলেই জাগতিক যাবতীয় সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করা যায়…।

নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ি মানুষ জনে গিজগিজ করতে লাগলো। সবাই পেতে চায় এই স্বর্গীয় সুতো। ঠাকুর আর তার পরিবারের লোক ভিড় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। সাথে সাথেই আশপাশের কয়েক বাড়ির পুরুষ যুবকরা স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গেলো। ঠাকুর মেপে মেপে এক বিগাত করে সুতো কাওকে কাওকে দিচ্ছেন বটে, কিন্তু বেশিরভাগেরই কপালে সেটা জুটছে না। ঠাকুর ভাবছে, এই অল্প সুতোয় কী করে সবাইকে খুশি করা যাবে… কেউ কেউ সুতো প্রাপ্তির জন্য নগদ দক্ষিণা প্রদান করছেন… কেউ কেউ মোটা অংক দিতেও প্রস্তুত… সুতো চাই… ঠাকুর কিংকর্তব্য বিমুঢ়…

‘স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে থেকে একজন ঠাকুরের কানে ফিসফিস করে বললো, ঠাকুর মশাই এ-ই অল্প সুতোয় সবাইকে খুশি করা যাবে না। তারচে আরও কিছু সুতোর ব্যবস্হা করলে ক্যামন হয়?’

‘ঠাকুর মশাই গম্ভীর গলায় বললেন, হুম…’

‘স্বেচ্ছাসেবক বললো, এক কাজ করি, আজকের মতো মায়ের দর্শন বন্ধ করে দি। আগামীকাল বেশি করে সুতো নিয়ে সবাইকে একটু একটু করে দিলে কেমন হয়? সবারইতো মায়ের আশীর্বাদ পাওয়ার অধিকার আছে, নাকি বলেন?’

‘ঠাকুর মশাই বললেন, হুম, তাই করো…’

এই এক বেলার মধ্যেই তার সেই পুরনো সতেজ আত্মবিশ্বাস ফিরে এলো। এবং সাথে সাথে তার মনের মধ্যে অজানা এক লোভের পায়রা ডানা ঝাপটাতে শুরু করলো…

পর্ব –০৪

এলাকাটা হিন্দু এলাকা। চেয়ারম্যানসহ মেম্বারদের বেশিরভাগই হিন্দু। গ্রামের প্রধান সড়ক মাটির। এই সড়ক থেকে ফিট দুয়েক ঢালুতে চিকন একটা মাটির পথ নেমে বেশ খানিকটা যাবার পর নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ি। এই চিকন রাস্তায় হেঁটে যাবার মতো অবস্থা এই মুহূর্তে নেই। এ্যাতো পরিমান মানুষের ভিড়, তার উপরে এক পশলা বৃষ্টি হবার কারণে কাঁদা কাঁদা হয়ে গেছে। নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ি বর্তমানে এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। একটা মুহূর্তের জন্যেও এই রাস্তা ফাঁকা হচ্ছে না। বাড়ির উঠোন, আশপাশের বাড়ি ঘর পর্যন্ত মানুষ জনে ভরা থাকছে প্রায় সবসময়। এলাকার চেয়ারম্যান নিজে নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ি যেতে গিয়ে কর্দমাক্ত পথে পিছলে পড়তে পড়তে কোনরকমে রক্ষা পেয়েছেন। সে কারণে তিনি নিজ উদ্যোগে বড়ো রাস্তা থেকে নারায়ণ ঠাকুরের বাড়ি পর্যন্ত পুরনো ইটের একটা সলিং করে দিয়েছেন। একেই বলে জনগণের সেবক। কতো দুর দুরান্ত থেকে লোকজন আসছে। কেউ কেউ বিছানায় পড়া রুগীও নিয়ে আসছে সাথে করে। সেই সব রুগীদের কেউ কেউ নাকি মায়ের স্বর্গীয় সুতো হাতে বেধে হেঁটে হেঁটেই বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। রাস্তার দু’ধারে ভ্রাম্যমান দোকানপাট বসে গিয়েছে। মিঠামন্ডাই বাতাসাসহ শাঁখাসিঁদুর শঙ্খ… এমনকি ধুতি গামছাও বিক্রি করতে বসে গেছে কেউ কেউ। মাত্র দু’দিনের মধ্যেই এই অজপাড়াগাঁ, এই গন্ডগ্রামটি আশপাশের সমস্ত গ্রামকে টপকে সবচেয়ে আলোচিত গ্রামে পরিনত হয়ে গেলো। গ্রামের মধ্যে বিরাজ করতে লাগলো উৎসবমুখর পরিবেশ। গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব পরিলক্ষিত হতে শুরু করলো। আর নারায়ণ ঠাকুর যাকে বলে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেলো…।

‘মহাদেব আর রমেশ প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলোনা, এসব কী হচ্ছে! একটা ঘোর লাগা ভাব নিয়ে তারা শুধু মানুষজনের ভিড় দেখে যাচ্ছিলো। এ যেনো না পারি কইতে, না পারি সইতে অবস্থা। কিন্তু অবস্থা এমন দাড়িয়েছে এখন আর চুপ করে বসে থাকা যায় না। তাই তারা জরুরী বৈঠকে বসেছে। রুদ্ধদ্বার বৈঠক যাকে বলে। তাদের এখন করনীয় শীর্ষক আলোচনার শুরুতেই রমেশ আক্ষেপ করে বললো, কী থেকে কী হয়ে গেলোরে ভাই, কিছুইতো বুঝতে পারছি না…।’

‘মহাদেব বললো, এভাবে চলতে থাকলে শালা ঠাকুরতো কিছুদিনের মধ্যেই কোটিপতি হয়ে যাবেরে…’

‘রমেশ বললো, কোথায় ম্যাগনেট বিক্রি করে আমরা কোটিপতি হবো, তা-না উল্টো…’

‘মহাদেব বললো, ঘটনা ফাস করে দিলে কেমন হয়?

‘রমেশ বললো, কেউ বিশ্বাস করবে নারে…।’

‘মহাদেব কিছুক্ষণ চিন্তামগ্ন হয়ে বসে থাকলো। তারপর আস্তে করে বললো, আমাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। চল ঠাকুরের সাথে সরাসরি কথা বলি। সে যদি বুনো ওল হয়, তো আমরাও বাঘা তেঁতুল। একা একাই সব খাবে, তা হবেনা। দরকার হলে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবো…।’

ভোরবেলা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। সন্ধ্যার পর মা’য়ের সাক্ষাৎ দেয়া নিষেধ আছে। এরইমধ্যে নারায়ণ ঠাকুর মায়ের দ্বারা একাধিকবার স্বপ্নাদিষ্ট হয়েছেন। স্বপ্নে মা তাকে বলেছে, তার আশীর্বাদের সুতো যেনো বিক্রি করা না হয়। তবে কেউ যদি খুশি হয়ে কিছু দিতে চায়, সেটাকে ফিরিয়ে দেয়া বা অবজ্ঞা করা চলবে না, গ্রহণ করতে হবে। সন্ধ্যার পরে কাওকে আর মায়ের সাক্ষাৎ দেয়া যাবে না। লাল সুতো পরিধান করতে হবে বা হাতের কব্জিতে… ইত্যাদি। মায়ের দেখানো স্বপ্নগুলো ঠাকুরের জন্য বেশ সুবিধাজনক হয়েছে বলেই মহাদেবের মনে হয়েছে। লাল সুতো বিক্রি করাতে মায়ের নিষেধাজ্ঞায় জনমনে ভক্তির প্রভাবটা আরও গাঢ় হয়েছে। তাতে করে অনেকে খুশি হয়ে মোটা অংক উপঢৌকন হিসেবে দিয়ে যাচ্ছে। হাতের কব্জিতে সুতো বাধার নিয়মে সুতো খরচ হচ্ছে কম। গলায় বা মাজায় বাধতে হলে বেশি সুতো লেগে যেতো, এদিক দিয়েও মা সহায় হয়েছেন। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর সন্ধ্যায় হিসাবনিকাশের ব্যাপারটাও মা বিবেচনায় রেখেছেন। সেকারণে সন্ধ্যার পরে দর্শন নিষেধ…

‘মহাদেব কৌতুক করে বললো, বুঝলি রমেশ মা’তো দেখছি পুরোপুরি ঠাকুরের পক্ষেই আছেন…’

‘রমেশ বললো, সব ভাঁওতাবাজি, আমরা যদি মুর্তি চুরি না করতাম…’

‘মহাদেব বললো, আস্তে আস্তে এ্যাখন এসব কথা বলা যাবে না, আগে ঠাকুরের সাথে কথা বলি…।’

ঠাকুর মশাই সন্ধ্যার পর আর ইদানিং কারো সাথে দেখা করতে চান না। এই সময়টাতে তিনি নিরিবিলি মন্দিরের মধ্যে একাই থাকেন। মহাদেব আর রমেশ সোজা মন্দিরের দরজায় গিয়ে দাড়ালো। দরজা ভেতর থেকে পুরোপুরি লাগানো না। একটু ফাঁক হয়ে ভেজানো রয়েছে। তারা দু’জন একসাথেই দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখার চেষ্টা করলো। বিশেষ কিছু দেখা গেলো না। কুপীর আলোয় ঠাকুরের পিঠের অংশ দেখা যাচ্ছে। ঠাকুর কিছুটা কুঁজো হয়ে কী যেন করছেন…।

‘মহাদেব হাত দিয়ে দরজা খানা ঠেলা দিয়ে ডাক দিলো, ঠাকুর মশাই, ও ঠাকুর মশাই…’

‘ঠাকুর মশাই চমকে উঠলেন, কে কে…!’

মহাদেব আর রমেশ একসাথেই মন্দিরের ভেতর ঢুকে গেলো। ঠাকুরের সামনে ছড়ানো ছিটানো খুচরা পয়সা, বিভিন্ন টাকার নোট এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। ঠাকুর সেগুলো আড়াল করার মতো একটা ভঙ্গি করলো। কিন্তু তার আগেই ওরা ঠাকুরের একদম কাছে চলে গেলো।

‘ঠাকুর বিব্রত হয়ে একটু ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বললো, তোরা, তোরা এখানে কী করিস? জানিসনা সন্ধ্যার পরে আসা নিষেধ? সকালে আসিস, এ্যাখোন যা…’

‘মহাদেব বললো, সকালে আসলে আমাদের কাজ হবেনা ঠাকুর মশাই, আমাদের কাজ সন্ধ্যার পরেই…।’

‘ঠাকুর বললো, মানে?’

‘মহাদেব বললো, মানে হচ্ছে মনটা শক্ত করেন ঠাকুর মশাই। এইযে আপনার মন্দির থেকে মুর্তি হারিয়ে গেলো, আবার ফিরে এলো… এসব ভুয়া খবর।’

‘ঠাকুর মশাই উত্তেজিত হয়ে বললেন, কী কী বললি!’

‘মহাদেব ফিসফিস করে বললো, আস্তে আস্তে ঠাকুর মশাই। লোকজন জানাজানি হয়ে গেলে আপনারই অসুবিধা হবে। তারচেয়ে আমি যা বলি মন দিয়ে শুনে যান…’

ঠাকুর চুপ করে গেলো।

‘মহাদেব বললো, আমরা একটা বড়ো অন্যায় করেছি ঠাকুর মশাই। মহাপাপ করেছি… মহাদেব একটু থামলো। ঠাকুর মশাই যেমন ছিলেন তেমন নিরব হয়েই রইলেন। মহাদেব আবার শুরু করলো। আমরা লোভ করেছি ঠাকুর মশাই, বিরাট লোভ। আমরা শুনেছিলাম আপনার এই কালি মুর্তির মধ্যে নাকি ম্যাগনেট আছে। সেই ম্যাগনেটের নাকি কোটি কোটি টাকা দাম। আমরা ভেবেছিলাম এই মুর্তি বিক্রি করে আপনার এই মন্দির সোনা দিয়ে গড়িয়ে দেবো। গ্রামে আরও বড়ো বড়ো মন্দির করে দেবো… তাই আমরা এই মুর্তি চুরি করেছিলাম…’

‘মহাদেবের কথা পুরোপুরি শেষ হবার আগেই ঠাকুর এক নিঃশ্বাসে বললো, মিথ্যে কথা। এসব ভাঁওতাবাজি কথাবার্তা আমার সাথে বলবি না, এখান থেকে যা…’

‘রমেশ বললো, মিথ্যে না ঠাকুর মশাই, মা কালির দিব্যি, আমিও ছিলাম সাথে…’

ঠাকুর চোখ পাকিয়ে রমেশের দিকে তাকালো।

‘মহাদেব বললো, সত্য আসলে এটাই ঠাকুর মশাই, আমাদের কাছে প্রমাণ আছে…।’

‘ঠাকুর বললো, কী প্রমাণ?’

‘প্রমাণ হচ্ছে আপনার মন্দিরেরঐ জানালা। ঐ জানালার মাঝের সিকটা ভাঙ্গা আছে। আলতো করে বসানো। এখনই আমি ওটাকে ফেলে দিতে পারি… ফাঁসকল দিয়ে মুর্তি এখান দিয়েই বের করে নিয়েছিলাম… আপনি এখানটায়, এই-যে এখানে ঘুমাচ্ছিলেন…’

ঠাকুর মশাই কোনো কথা বললেন না। চুপ করে বসে রইলেন।

‘মহাদেব আবার শুরু করলো, যখন দেখলাম মুর্তিতে কোনো ম্যাগনেট ফ্যাগনেট নেই, তখন সেটাকে আবার মন্দিরের দরজায় আমরাই রেখে গিয়েছিলাম। মুর্তির গায়ে যে লাল সুতো সেটা আমার গামছার সুতো। গামছা দিয়ে পেচিয়ে রেখেছিলাম, ঐ গামছার সুতো মুর্তির গায়ে জড়িয়ে গিয়েছিলো। মুর্তির পায়ের মাটি আমি নিজ হাতে লাগিয়েছিলাম…’

‘ঠাকুর বললো, চুপ কর…।’

‘মহাদেব বললো, আমরা অন্যায় করেছি ঠাকুর মশাই, মহা অন্যায়। কিন্তু এখন আমরা প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমরা অন্যায় স্বীকার করতে চাই…’

‘ঠাকুর বললো, এজন্য তোদের কী সাজা হবে জানিস?’

‘মহাদেব বললো, যে সাজাই হোক মাথা পেতে নেবো। কিন্তু আপনি যে এই কয়দিনে লাল সুতো দিয়ে কতো মানুষদের কাছ থেকে কতো টাকাপয়সা নিয়েছেন তার কী হবে ঠাকুর মশাই?’

‘ঠাকুর মশাই যেনো মহা ফাঁপড়ে পড়ে গেলো। কি বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না…।’

‘রমেশ বললো, আমি একটা কথা বলি ঠাকুর মশাই। মহাদেব যা বললো সবই সত্যি, কিন্তু গোপন। আমি বলি কি এই গোপন সত্যি গোপনই থাক…’

‘ঠাকুর মশাই একমুহূর্ত কী যেনো ভাবলো। তারপর দু’জনের দু-হাত চেপে ধরে বললো, ঠিক কথা, চেপে যা..।’

‘মহাদেব বললো, এমনিই?’

‘ঠাকুর বললো, মানে?’

‘মানে হচ্ছে এমনি এমনিই চেপে যাবো? আপনি যে এই ক’টা দিনে হাজার হাজার… লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেন, সেটাতো আমাদের জন্যই…’

‘ঠাকুর বললো, কতো চাস?’

‘মহাদেব বললো, ফিফটি ফিফটি…।’

‘হুম বেশি হয়ে যায়… ঠাকুর আপত্তির সুরে বললো।’

‘কীসের বেশি? যা পাচ্ছেন তাতো আমাদের জন্যই…মহাদেব বললো।’

‘তবুও…’

‘কোনো তবুও না ঠাকুর মশাই। এই ক’দিন যা কামিয়েছেন সেটার ভাগ চাচ্ছিনে। কিন্তু কাল থেকে ফিফটি ফিফটি… না হলে…’

‘ঠাকুর বললো, আচ্ছা যা কাল থেকে। তবে সাবধান, দেখিস কাকপক্ষীও যেনো টের না পায়…”

“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ঠাকুর মশাই, কাকপক্ষী কেনো, মা কালিও টের পাবে না…। তাহলে কাল থেকে আমরা দু’জন হচ্ছি আপনার মন্দিরের প্রধান… প্রধান… মহাদেব সঠিক শব্দটা খুঁজে পাচ্ছে না দেখে ঠাকুর মশাই বললেন, সেবাদাস। তোরা হচ্ছিস মন্দিরের সেবাদাস…।’

‘মহাদেব বললো, আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে যাই বলেননা কেনো, শুধু ফিফটি ফিফটি মনে রাখবেন…।’

‘ঠাকুর বললেন, ভোর থাকতে থাকতে চলে আসিস… এখন যা…।’

‘মহাদেব আর রমেশ বিদেয় হলো। যেতে যেতে মহাদেব বললো, বুঝলি, টাকাই হচ্ছে সবচেয়ে বড়ো ভগবান। ওসব ধর্মটর্ম হচ্ছে সব ভুয়া কথা। সব ঠাকুরের ভগবানই টাকা। টাকা ছাড়া কী আর ভগবানের মুর্তি ফ্রিতে পাওয়া যায়…?’

ভোরবেলা কাক ডাকার আগেই তারা নারায়ণ ঠাকুরের মন্দিরে হাজির হলো। বেলা উঠার সাথে সাথে দর্শনার্থীদের ভিড় জমতে শুরু করলো। দশ টাকা, বিশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা থেকে পাঁচশো টাকা হাজার টাকার নোটও মায়ের সামনে পড়তে লাগলো। মহাদেব একফাঁকে রমেশের কানে কানে বললো, ‘কে বলেছে ম্যাগনেট নেই? আতপ চাল না টানুক, আমপাবলিকের পকেটের টাকাতো ঠিক টেনে টেনে বের করে আনছে, ম্যাগনেটতো আছে…।’

‘সন্ধ্যার পর সব নিরব হলে, মন্দিরের ভেতর তিনজনে হিসাবনিকাশ করতে বসে গেলো। সমান সমান অর্ধেক টাকার ভাগ নিয়ে মহাদেব আর রমেশ বাড়ির পথে হাঁটা শুরু করলো। মাঝপথে রমেশ বললো, দেখেছিস মুর্তিতে ম্যাগনেটের খবরটা কিন্তু আমিই দিয়েছিলাম…।’

‘মহাদেব বললো, তুইতো মানাও কম করিসনি। তোর কথা যদি শুনতাম, যদি সাহস করে কাজটা না করতাম, তাহলে আজ এই সত্যিকারের ভগবানের দেখা কী পেতাম…?’

উল্টো দিক থেকে দু’তিনজন লোক কথা বলতে বলতে হেঁটে আসছিলো দেখে মহাদেব আর রমেশ চুপ করে গেলো। লোকগুলো তাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় বলছিলো, যাই বলিসনা কেনো ভাই, ভগবানের লিলা বোঝা বড়ো ভার। কার কখন কপাল ফেরে কিছুই বলা যায় না। মায়ের লাল সুতো হাতে বাধার পর আমার শনির রাহু কেটে গেছেরে। ব্যবসাপাতি আগের থেকে অনেক ভালো। শরীরের মধ্যে একটা যৌবন বয়সের উদ্যম ফিরে এসেছে… সব তার ইচ্ছে… জয় মা, জয়…।।

Related News :

নজরুল আবৃত্তিকে আধুনিক শিল্পের মর্যাদা দেন কাজী সব্যসাচী

নজরুল আবৃত্তিকে আধুনিক শিল্পের মর্যাদা দেন কাজী সব্যসাচী

নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির সেমিনার আগামীকাল

নজরুল বর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির সেমিনার আগামীকাল

চাঁদপুরে সাত লেখক-শিল্পী পেলেন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি দোনাগাজী পদক

চাঁদপুরে সাত লেখক-শিল্পী পেলেন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি দোনাগাজী পদক

'অনুপ্রাস' জাতীয় কবি সংগঠনের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠিত

'অনুপ্রাস' জাতীয় কবি সংগঠনের ৪১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠিত

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করেছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদযাপন করেছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী

বাংলা একাডেমিতে গাজী শামছুর রহমান স্মারক বক্তৃতা-২০২৬ অনুষ্ঠিত

বাংলা একাডেমিতে গাজী শামছুর রহমান স্মারক বক্তৃতা-২০২৬ অনুষ্ঠিত

'অনুপ্রাস' জাতীয় কবি সংগঠনের ঢাকা মহানগর কমিটি ঘোষণা

'অনুপ্রাস' জাতীয় কবি সংগঠনের ঢাকা মহানগর কমিটি ঘোষণা

জাতীয় কবি নজরুলের বিদ্রোহ, বিপ্লব, মানবিকতা ও নান্দনিক সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা

জাতীয় কবি নজরুলের বিদ্রোহ, বিপ্লব, মানবিকতা ও নান্দনিক সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা

কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

চাঁদপুরে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন ৬ লেখক

চাঁদপুরে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার পাচ্ছেন ৬ লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
×